তানভীর ইবনে মোবারক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার , ৬ ফেব্রুয়ারি , ২০২৫
ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানে টানা ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনের অবসানের পর ছাত্রলীগ মুক্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর সহঅবস্থানের অভূতপূর্ব এক দৃশ্যের জন্ম দিয়েছিল।তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন নিয়ে ক্যাম্পাসের ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে এই ছয়মাসে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ কয়েকটি দল বেশ কয়েকমাস ধরেই নতুন প্রশাসনের কাছে জাকসু নির্বাচনের জোর দাবি জানিয়ে আসছে। বিপরীতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলসহ কয়েকটি বাম সংগঠন নির্বাচনের আগে জাকসুতে বেশ কিছু সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে মিত্রপক্ষগুলোর মধ্যে সময়ে সময়ে বিরোধ প্রকাশ্যে আসলেও তা বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দেয়নি। তবে নিজের অবস্থানে অনড় সংগঠনগুলো এখন নিজ নিজ দাবি আদায়ে দিনে দিনে প্রশাসনের ওপর চাপ বৃদ্ধির কৌশলেই হাঁটছে।
ক্যাম্পাসে বর্তমানে কোনো সংগঠনের একক আধিপত্য নেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ছাত্র রাজনীতির গতিপথ অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে৷ এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ অন্য কোন রাজনৈতিক দলকে ক্যাম্পাসে ভিড়তে দেয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বাম রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কার্যক্রম জারি রেখেছিলো। ক্যাম্পাসে অথবা দেশের যেকোন প্রান্তে কোন অঘটন ঘটলে নিয়মিত প্রতিবাদ করে আন্দোলন করে গেছে তারা। তবে ছাত্রদল অথবা ছাত্র শিবিরকে কোন কার্যক্রম করতে দেয়নি তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ।
কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের উত্থান ঘটেছে। তারা ইতিমধ্যে ক্যাম্পাসে নিজেদের কার্যক্রম শুরু করেছে।
পাশাপাশি শোনা যাচ্ছে গণ অভ্যুত্থানের সময়ে গঠিত হওয়া বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক কমিটি খুব শীগ্রই রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। এ সংক্রান্ত ইঙ্গিত নেতাকর্মীদের ফেইসবুক পোস্টে দেখা যাচ্ছে।
এছাড়া ক্যাম্পাসে অন্যান্য অনেক সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো প্রত্যেকেই বিভিন্নভাবে জাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। যার প্রেক্ষিতেই জাকসুর রোডম্যাপ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যদিও রোডম্যাপ অনুযায়ী তফসিল ঘোষণা এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
সংস্কারই বাধা?
গত ৩১ ডিসেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জাকসু নির্বাচনের একটি রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে।
রোডম্যাপ অনুযায়ী গত ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে আটকে যায় তফসিল। একই দিনে শিক্ষার্থীরা পাল্টা অবস্থান নিলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আজ ৬ ফেব্রুয়ারি তফসিল ঘোষণার আশ্বাস দেওয়া হয়। আশ্বাস পেয়ে সেদিন মধ্যরাতে প্রশাসনিক ভবন ত্যাগ করে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ. কে. এম. রাশিদুল ইসলাম বলেন, জাকসুর রোডম্যাপ অনুযায়ী আজকে তফসিল ঘোষণা এখনো হয় নি, তবে সন্ধ্যা ৭টায় পরিবেশ পরিষদের মিটিং আছে। সেখানে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আশা করছি, রাত ১০টার আগেই একটা সুরাহা হবে।
এর আগে সর্বশেষ ২৬ জানুয়ারি নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার ও আয়োজনের জন্য গঠিত হওয়া পরিবেশ পরিষদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬টি বিভাগ ও ৪টি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। সেখানে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী প্রতিনিধি জাকসু নির্বাচনের রোডম্যাপ অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছে।
একই দিনে পরিবেশ পরিষদ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন। সেখানে ছাত্রদল কর্মীরা উপস্থিত হয়ে জাকসু সংস্কারের দাবিতে মিছিল স্লোগান দিয়ে সভা শুরুর আগেই বের হয়ে যায়। তাদের দাবি ছিল আগে সংস্কার পরে জাকসু নির্বাচন। এতে ক্ষুব্ধ হয় উপস্থিত অন্যান্য সংগঠনগুলো। তবে সংস্কারের বিষয়ে প্রশাসনকে দোষারোপ করে তারা।
এদিকে ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতি জাকসু বানচালের দিকেই এগুচ্ছে বলে শংকা প্রকাশ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
এদিকে গত ১ ফেব্রুয়ারি তফসিল ঘোষণার দিন ছাত্রদলের মিছিল ও প্রশাসনিক ভবনে অবস্থান কর্মসূচি পালন এবং পরিবেশ পরিষদের মিটিংয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহিরউদ্দীন মোহাম্মদ বাবর ও সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনিক তাদের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেয়।
এতে ক্ষোভ জানায় শিক্ষার্থীরা এবং পরবর্তীতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন হল প্রদক্ষিণ করে প্রশাসনিক ভবনে অবস্থান নেয়। শেষে ৬ ফেব্রুয়ারি তফসিল ঘোষণার আশ্বাসে মধ্যরাতে যার যার হলে হলে ফিরে যায় শিক্ষার্থীরা।
এর আগে গত ২৬ নভেম্বর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জাবি শাখার নেতৃত্বে সারাদেশে চলমান সংকট নিরসন ও ফ্যাসিবাদ মোকাবেলায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ১০টি ছাত্র সংগঠনের অংশগ্রহণে নতুন ঐক্য গঠন এবং সংগঠনগুলো থেকে প্রতিনিধি নিয়ে ৭ সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সেসময় ঐক্যে থাকা সংগঠনগুলো হলো- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলন, জাস্টিস ফর জুলাই, জুলাই গণহত্যা বিচার নিশ্চিত পরিষদ, বিপ্লবী সাংস্কৃতিক মঞ্চ, ছাত্র অধিকার পরিষদ, জাহাঙ্গীরনগর সংস্কার আন্দোলন ও আধিপত্যবাদ বিরোধী মঞ্চ।
ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন পর ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বের জায়গা জাকসু নির্বাচন নির্বাচন নিয়ে গণঅভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলনের আহবায়ক আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, “দীর্ঘ ৩৩ বছর পরে অচল জাকসু সচল করার শিক্ষার্থীদের যে প্রাণের দাবি সে লক্ষ্যে প্রশাসনের ভূমিকাকে সাধুবাদ জানাই। বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে শিক্ষার্থীদের বৈধ প্রতিনিধি তৈরির জন্য নির্বাচনের মাধ্যমে জাকসু কার্যকর করা জরুরি।
তিনি আরো বলেন, যদি প্রশাসন আজকে ৬ ফেব্রুয়ারি যে জাকসু তফসিল ঘোষণার কথা তা না করে, কারো দ্বারা প্ররোচিত হয়ে অথবা কোন দলীয় ব্যানারের কারণে নড়চড় করে তাহলে আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে সকল ষড়যন্ত্র রুখে দাড়াবো।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাবি শাখার আহবায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জল বলেন, “দীর্ঘ ৩৩ বছরের অচলাবস্থার পর শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি জাকসু নির্বাচন। ৫ আগস্টের গণ অভ্যুত্থানের পর থেকে আমরা শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে জাকসু সচলের লক্ষ্যে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছি। তবে শাখা ছাত্রদল ও বাম সংগঠনগুলোর চাওয়া সংস্কারের পরেই জাকসু নির্বাচন হোক। আমরাও এর বিরুদ্ধে নই, কিন্তু জাকসু গঠনতন্ত্রে স্পষ্টতই বলা আছে, কেবল জাকসুর নির্বাচিত কমিটিই এটি সংস্কার করতে পারবে। তবে আমরা বিশ্বাস করি, জাকসুর সভাপতি নিজ ক্ষমতাবলে এটি পরিবর্তন ও সংস্কার করতে পারে।”
শাখা শিবিরের সভাপতি মুহিবুর রহমান বলেন, “যেহেতু জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, এতগুলো তাজা প্রাণ ঝড়েছে কেবলে শিক্ষা সংস্কারের উদ্দেশ্যেই। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার হচ্ছে না, সেই সংস্কারের জন্যই ছাত্র সংসদ প্রয়োজন, জাকসু প্রয়োজন।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহিরউদ্দীন মোহাম্মদ বাবর বলেন, “জাকসু সংস্কারের দাবি শুধু আমাদের একার নয়, এই দাবির সাথে বাম সংগঠন, অন্যান্য ক্রিয়াশীল সসংগঠন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঐক্যমত রয়েছে। কেননা আমাদের দাবি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। অন্যান্য সকলের সাথে এক হয়ে আমরাও চাই ছাত্রলীগের বিচার নিশ্চিত করেই, এবং ভোটার তালিকা থেকে ছাত্রলীগের নাম বাদ দিয়ে সংস্কারের পরে জাকসু নির্বাচন সম্পন্ন হোক।”
জাকসু বানচালে ছাত্রদলের ভূমিকা নিয়ে বাবর আরও বলেন, জাকসু বানচালের জন্য ছাত্রদলকে দোষারোপ করা হচ্ছে, এটি প্রপাগাণ্ডা ছাড়া আর কিছু নয়। কেননা এর আগে সর্বশেষ জাকসুসহ পরপর ৩ বার ছাত্রদলের জয়ই নিশ্চিত করে আমরা কখনো জাকসুর বিপক্ষে নই।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, “জাকসু নির্বাচনের তফসিল আজকে যে ঘোষণা দেয়ার কথা ছিল সে বিষয়ে পরিবেশ পরিষদের একটা মিটিং আছে সন্ধ্যায়। পাশাপাশি সংস্কার বিষয়ে যে কমিশন গঠন করা হয়েছে তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী মতামত এসেছে সংস্কারের পক্ষে, বিপক্ষে। তবে আজকে সন্ধ্যার মিটিংয়ের পরেই তফসিলের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।”