জাবি প্রতিনিধি প্রকাশিত: শনিবার , ১৬ আগস্ট , ২০২৫
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ভর্তিতে পোষ্য কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিল প্রশাসন। কিন্তু সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে সেটি আবার নতুন নামে ফিরে এসেছে। বুধবার (১৩ আগস্ট) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ভর্তি পরিচালনা কমিটির সভায় ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’ শিরোনামে কিছু শর্ত যুক্ত করে এ ব্যবস্থা রাখা হয়।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, উপাচার্য নিজে পোষ্য কোটা বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার পর সেটিকে ভিন্ন নামে ফিরিয়ে আনা প্রতারণার শামিল। তাদের মতে, এভাবে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তবে প্রশাসনের ব্যাখ্যা, এটি পোষ্য কোটা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সীমিত আকারে দেওয়া ‘প্রতিষ্ঠানিক সুবিধা’।
রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন সিদ্ধান্তে কেবল শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানরাই এ সুবিধা পাবেন। পূর্বে এ কোটার আওতায় ভাই, বোন কিংবা স্ত্রীও ভর্তির সুযোগ পেতেন। এবার সর্বোচ্চ ৪০ জন শিক্ষার্থী এই কোটায় ভর্তি হতে পারবে এবং প্রতিটি বিভাগে সর্বোচ্চ চারজনের বেশি সুযোগ পাবে না। একইসঙ্গে, একজন অভিভাবক কেবল একজন সন্তানকে এ সুবিধায় ভর্তি করাতে পারবেন এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের চাকরিজীবীর সন্তান সেই বিভাগে ভর্তি হতে পারবে না। তবে পাস নম্বর কত হবে, তা নিয়ে এখনও শিক্ষকদের মধ্যে মতভেদ রয়ে গেছে।
কেন্দ্রীয় ভর্তি কমিটির সদস্যসচিব সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা জানান, “পাস নম্বর নিয়ে শিক্ষকরা একমত হতে পারেননি, তাই বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি। তবে অন্য সব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে।”
গত ২ ফেব্রুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ১৪ জন শিক্ষার্থী আমরণ অনশনে বসেন। তাদের দাবি ছিল, পোষ্য কোটা বাতিল করে প্রকৃত অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের জন্যই কোটার সুযোগ রাখা হোক। প্রায় ১৯ ঘণ্টা অনশন চলার পর উপাচার্যের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা তা ভাঙেন। সেদিন রাতে উপাচার্য ঘোষণা দেন—পোষ্য কোটায় সর্বোচ্চ ৪০ জন ভর্তি হতে পারবে এবং সুবিধা কেবল সন্তানের জন্য সীমিত থাকবে। সেইসঙ্গে পাস নম্বর নির্ধারণ করা হয় ৪০ শতাংশ।
তবে ওই সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৪ ফেব্রুয়ারি অবরোধ ডাকেন। পরদিন শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে পোষ্য কোটা পুরোপুরি বাতিলের দাবি তোলেন। উত্তেজনার মধ্যে উপাচার্য তখন কোটাটি সম্পূর্ণ বাতিলের ঘোষণা দেন।
উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, “শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে কোটা স্থগিত রাখা হয়েছিল। তবে ভর্তির বিজ্ঞপ্তিতে পোষ্যদের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। একে পুরোপুরি বাতিল করলে আইনি জটিলতা তৈরি হতো। রিট হলে কোটাটি আবার ফিরিয়ে আসত। তাই এ বছর সংস্কারের মাধ্যমে ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’ হিসেবে রাখা হয়েছে। আগামী বছর বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করা যেতে পারে।”
আন্দোলনকারী ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম ভূঁঞার অভিযোগ, “আমরা ভেবেছিলাম প্রশাসন আমাদের দাবি মেনে নিয়েছে। কিন্তু এখন দেখছি আগের নিয়মই অন্য নামে চালু করা হয়েছে। এটা আসলে প্রহসন।”
পোষ্য কোটা নিয়ে টানাপোড়েনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম বিলম্বিত হয়েছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা ফেব্রুয়ারিতে শেষ হলেও আগস্ট পর্যন্ত নবীন শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হয়নি। নবীন শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে ক্লাস ও পরীক্ষা চলছে, সেখানে তারা ভর্তি নিয়েই অনিশ্চয়তায় আছেন।
গত পাঁচ বছরে মোট ২৭৮ জন শিক্ষার্থী পোষ্য কোটায় ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৯-২০ সেশনে ৫৯ জন, ২০২০-২১ সেশনে ৫৬ জন এবং সর্বশেষ ২০২৩-২৪ সেশনে ৫৩ জন ভর্তি হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে ন্যূনতম পাস নম্বর পেলেই পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তারা।