নোবিপ্রবি প্রতিনিধি, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: শনিবার , ৮ মার্চ , ২০২৫
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ। তবে ক্যাম্পাসটিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ এককভাবে সক্রিয় ছিল। আর নতুন বাস্তবতায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য সবগুলো ছাত্র সংগঠন সক্রিয় রয়েছে।
দেশের তুলনামূলক নবীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। তবে রাজনীতির চেয়ে ছাত্র সংসদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় করে নেতৃত্ব তৈরির পক্ষে কথা বলেছেন অনেক শিক্ষার্থী।
ছাত্র রাজনীতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দ্বৈত অবস্থানের অবসান করে একটি স্পষ্ট আচরণবিধি আশা করছেন অনেক শিক্ষার্থী।
আর নোবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল চাইছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফোরামে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব। সেক্ষেত্রে ছাত্র সংসদ নির্বাচন কিংবা এই ধরনের কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করার পক্ষে তিনি।
সম্প্রতি ছাত্র সংগঠনগুলোর চলমান কার্যক্রম, ভবিষ্যত চিন্তা ও ছাত্ররাজনীতি নিয়ে বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন ক্যাম্পাস মিরর ডটনেট এর প্রতিনিধি মুদ্দাচ্ছির আহমদ।
নোবিপ্রবি রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্যাম্পাসে “সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ” সেই প্রসঙ্গটি সামনে তুলে আনেন তিনি। পাশাপাশি ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ অন্যান্য সংগঠনগুলো যে তাদের সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সেই চিত্রও তুলে ধরেন।
এমআইএস ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জায়েদুল ইসলাম ক্যাম্পাস মিররকে বলেন, “ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু রাজনীতি বিদ্যমান থাকা উচিত। কিন্তু লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি ক্যাম্পাসে ছাত্রদের মধ্যে বিবাদ ছাড়া কোনো সুফল বয়ে আনে না। ছাত্ররাজনীতির অতীত ইতিহাস আমলে রেখে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু রাজনীতি চর্চার দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া সময়ের দাবি।”
প্রশাসনের কাছে তিনি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের নামে একটা ঘোলাটে পরিবেশ সৃষ্টি না করে অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে স্বচ্ছ একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চার সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান।
ফলিত গণিত বিভাগ ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আবেদিন মিনহাজ মতামত হচ্ছে, মানুষ রাজনৈতিক প্রাণী, জীবন ও জীবিকার সব সিদ্ধান্তেই রাজনীতির প্রভাব বিদ্যমান। তাই রাজনৈতিক বিষয়ে ন্যূনতম হলেও সচেতন হওয়া উচিত। আবার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রেও ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা অনেক। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোর সুস্থ পরিবেশ নষ্টের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায় দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি। এই উভয় সংকট নিরসনে ক্যাম্পাসের ছাত্ররাজনীতি হওয়া উচিত সুস্থ, গঠনমূলক ও নিরপেক্ষ। যদি দলীয় সংগঠনগুলো এমন সুষ্ঠু পরিবেশের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ক্যাম্পাসে দলীয় ব্যানারে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত। এর ভালো বিকল্প হতে পারে ছাত্র সংসদভিত্তিক সুস্থ ছাত্ররাজনীতি, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নোয়াখালী জেলার সদস্যসচিব নোবিপ্রবি এমআইএস বিভাগের শিক্ষার্থী বনি ইয়ামিন বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীসহ আমরা সকলেই চাচ্ছি ছাত্র সংসদ নির্বাচন হোক, যেটা নিয়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রস্তুতি চলছে। তবে কিছু কিছু রাজনৈতিক দল সেটি চাচ্ছে না; তারা বিষয়টিকে বাধাগ্রস্ত করতে চাচ্ছে।
“আমাদের ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি আগে থেকেই নিষিদ্ধ। তাই ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্র সংসদের ব্যাপারে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সাথে ডায়ালগ করুক, শিক্ষাঙ্গনে কতটুকু রাজনৈতিক চর্চা করা যাবে বা তার পরিসীমা কতটুকু হবে তা নির্ধারিত হোক। আর যদি শিক্ষার্থীরা রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাস চায় তাহলে তাই থাকুক,” বলেন বনি ইয়ামিন।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নোবিপ্রবির সমন্বয়ক ও ফলিত গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম হাসান বলেন, নোবিপ্রবিতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও নামে বেনামে বিভিন্ন সংগঠন ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান পরিষ্কার না আমাদের কাছে। প্রশাসনের উচিত ওপেন ডিবেটের আয়োজন করা এবং ছাত্রদের ম্যান্ডেট নেওয়া। যদি ক্যাম্পাসের মেজরিটিরা দলীয় ছাত্ররাজনীতি চায় এবং কেমন রাজনীতি চায়; সেসকল সব বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
ছাত্রশিবির নোবিপ্রবি শাখার সভাপতি আরিফুল ইসলাম ক্যাম্পাস মিররকে বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন গণতান্ত্রিক চর্চার অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে ছাত্র রাজনীতির মূল কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। তবে স্বৈরাচারী শাসনের সময় ছাত্র রাজনীতিতে দমন-পীড়ন বৃদ্ধি পায়, এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত না হওয়ায় গণতান্ত্রিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র ঐক্য আন্দোলন সামরিক শাসকের পতন নিশ্চিত করে। কিন্তু ২০০০-এর দশকে এসে ছাত্র রাজনীতি ক্রমেই দলীয়করণ, সহিংসতা ও ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় রূপ নিতে শুরু করে, যা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতাকে ব্যহত করেছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরিয়ে আনা হয়, তবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন পুনরায় চালু করতে হবে এবং ছাত্র রাজনীতিকে সহিংসতা ও লেজুড়বৃত্তির বাইরে আনতে হবে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নোবিপ্রবি শাখার আহ্বায়ক নূর হোসেন বাবু বলেন, “আমরা মনে করি আগে ছাত্র রাজনীতি উন্মুক্ত করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। যার যার অবস্থান থেকে রাজনীতি চর্চার পথ উন্মুক্ত হলে পরেই ছাত্র সংসদের দিকে চিন্তা কিরা যায়। কেননা দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাষনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ফলে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কাঠামো কিছুটা অগোছালো যা গোছানোর কাজ চলমান। নোবিপ্রবিতে সেটা প্রক্রিয়াধীন। বিপরীতে অন্যান্য সংগঠন প্রকাশ্য রাজনীতি না করা কিংবা কোনো কোনো সংগঠন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঝুঁকিপূর্ণ লড়াইয়ে মুখোমুখি না হওয়ার কারণে নিজেরা সাংগঠনিকভাবে অক্ষত থেকেছে। নয়তো ছাত্রলীগের মধ্যে আত্মগোপনের মাধ্যমে নিজেদের সুসংগঠিত রেখেছে। এমতাবস্থায় ছাত্রসংসদ নির্বাচন কখনোই প্রতিযোগিতামূলক হবে না বরং একটা গোষ্ঠীকে একচ্ছত্র সুবিধা দেওয়ার ক্ষেতে তৈরি হবে।
নূর হোসেন বাবুর মতে এখন থেকে একটা যৌক্তিক সময় পর্যন্ত (সেটা হতে পারে এক থেকে দেড় বছর) ছাত্ররাজনীতি উন্মুক্ত থাকা উচিত। সবাই সবার মতো সাংগঠনিক কার্যক্রম করার মাধ্যমে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হওয়ার পরেই সবার ঐক্যমতের ভিত্তিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়া উচিত।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের নোবিপ্রবি শাখার সভাপতি মো. খলিল উল্লাহ বলেন, “রাজনীতি বলেন আর ছাত্র রাজনীতি বলেন এটা দেশের একজন সাধারণ নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। রাজনীতিতে সবাইকে একই চক্ষুতে কল্পনা করা উচিত না। ক্যাম্পাসে বিগত স্বৈরাচার সরকারের ছাত্র সংগঠন যে অপকর্ম করেছে তার দায় অন্য সংগঠনগুলোর উপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার কাম্য নয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামতেরও গুরুত্ব দিতে হবে। সে হিসেবে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস প্রশাসন যদি ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি না চায়, তাহলে আমরাও তাদের মতামতের সাথে শ্রদ্ধাশীল থাকবো। তবে একটি ক্যাম্পাসে অভ্যন্তরীন নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষা, শিক্ষার্থীদের যেকোনো প্রয়োজনে তাদের পাশে থাকা, ক্যাম্পাসের সুশৃঙ্খল সৌন্দর্য ফেরাতে অবশ্যই আমরা ছাত্র সংসদের পক্ষে।
এ ব্যাপারে নোবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, বিগত অভিজ্ঞতা থেকে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির যে ভয়াবহতা তা ছাত্ররা দেখেছে, এক্ষেত্রে ছাত্ররা লেজুরবৃত্তির ছাত্র রাজনীতি চায় না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বডিতে থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।
“আমরা চাই মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বে ও আমাদের ফ্যাকাল্টিভিত্তিক যেসব ক্লাস প্রতিনিধিরা আছে তাদেরকেই প্রতিনিধি হিসেবে নেতৃত্বে নিয়ে আসতে। আমরা সুস্থ ধারার রাজনীতি চাই, শুধু শিক্ষার্থীদের চাহিদার আলোকেই সুস্থ ধারার রাজনীতি হবে, কোন প্রকার লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নয়, যা শিক্ষার্থীদের আবেদন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে। সেটা হলেই সব ক্ষেত্রে সুবিধা হবে,” বলেন উপাচার্য।