প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: শনিবার , ১৬ আগস্ট , ২০২৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তিন বছর পর যাত্রা শুরু করে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ’। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৩ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে নামকরণ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—সব ঐতিহাসিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এই সংসদ। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনেও ডাকসু ছিল ছাত্রসমাজের অগ্রণী শক্তি।
স্বাধীনতার আগে প্রতিষ্ঠিত আরও কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও ডাকসুর আদলে ছাত্র সংসদ গঠিত হয়েছিল। তবে স্বাধীনতার পর এসব সংসদের কার্যক্রম ধীরে ধীরে অনিয়মিত হয়ে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে যে ৪৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, তাদের আইনেই ছাত্র সংসদের কোনো বিধান রাখা হয়নি। ব্যতিক্রম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ১৯৯১ সালে সংবিধানের মাধ্যমে ছাত্র সংসদ গঠিত হয়।
সম্প্রতি ছয় বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু) ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাকসু) নির্বাচনেরও তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এর পর থেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র সংসদ গঠনের দাবি নতুন করে জোরালো হয়ে উঠেছে।
মাওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনশন
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (মাকসু) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠার দাবিতে অনশন শুরু করেছেন শিক্ষার্থী আক্তারুজ্জামান সাজু। সোমবার (১১ আগস্ট) সকাল থেকে তিনি প্রশাসনিক ভবনের সামনে আমরণ অনশন শুরু করেন। পরে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী এতে সংহতি জানান। এর আগে ২১ জুলাই একই দাবিতে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছিল। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনেও ছাত্র সংসদের কোনো ধারা নেই।
শিক্ষার্থীরা জানান, বারবার দাবির পরও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সর্বশেষ ২ আগস্ট প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে ১০ আগস্টের মধ্যে রিজেন্ট বোর্ডে প্রস্তাব উত্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রোডম্যাপের দাবি
১২ আগস্টের মধ্যে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের বক্তব্য, গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের বিকাশ ও শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় ছাত্র সংসদ অপরিহার্য। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, আইনে উল্লেখ না থাকায় নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব নয়। এ জন্য তারা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সিন্ডিকেট ইতোমধ্যে ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নীতিমালা’ অনুমোদন করেছে। এখন তা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। অনুমোদন মিললেই দ্রুত রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে।”
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান
দেশের স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনেও ছাত্র সংসদের বিধান নেই। শিক্ষার্থীরা সম্প্রতি সংসদ প্রতিষ্ঠার দাবিতে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি জমা দিলেও প্রশাসন বিষয়টিকে জটিল বলছে।
উপাচার্য ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বণিক বলেন, “আমরা ছাত্র সংসদ বিষয়ে আন্তরিক। তবে আইনে উল্লেখ না থাকায় এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। অন্য যে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে সংসদের কথা নেই, তারাও এখনও কোনো উদ্যোগ নেয়নি।”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন
৪ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচন এবং সম্পূরক বৃত্তির দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। একই দিনে তারা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপিও জমা দেয়। স্মারকলিপিতে বলা হয়, “ছাত্র সংসদ কেবল একটি নির্বাচন নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব বিকাশের প্ল্যাটফর্ম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এ অধিকার পাওয়ার যোগ্য।”
আরও বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ছাত্র সংসদের দাবি তুলেছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য, আইনে উল্লেখ না থাকায় তারা নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে পারছেন না। এছাড়া এ ধরনের নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তারা।
বিশেষজ্ঞের মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম মনে করেন, ছাত্র সংসদ গণতান্ত্রিক চর্চা ও নেতৃত্ব গড়ে তোলার অন্যতম ক্ষেত্র। তার ভাষায়, “ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা ও নেতৃত্ব গঠনে অপরিহার্য। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে সংসদের উল্লেখ নেই, তারা আইন সংশোধনের মাধ্যমে এ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি। শিক্ষার্থীদের উচিত এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত অর্থে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে রাজনীতি করা।”