জাবি প্রতিনিধি প্রকাশিত: শুক্রবার , ২২ আগস্ট , ২০২৫
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে অংশ নিতে ২৫টি পদের বিপরীতে রেকর্ডসংখ্যক ২৭৩টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) বিকেল ৫টায় এক ব্রিফিংয়ে জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক একেএম রাশিদুল আলম এ তথ্য জানান।
দিনভর ক্যাম্পাসজুড়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে প্রার্থীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সকাল থেকেই কমিশন দপ্তরে সমর্থক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করে। প্রার্থীদের বক্তব্য, স্লোগান ও মিছিলের মধ্য দিয়ে পুরো ক্যাম্পাসে এক ধরনের নির্বাচনী আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।
বৃহস্পতিবার বিকালে ইসলামী ছাত্রশিবির ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ নামে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করে। এতে ভিপি পদে আরিফুল্লাহ আদিব, জিএস পদে মাজহারুল ইসলাম, এজিএস পদে ফেরদৌস আল হাসান, নারী এজিএস পদে আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলাকে মনোনীত করা হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে আবু উবায়দা উসামা, পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ সম্পাদক পদে সাফায়েত মীর, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে জাহিদুল ইসলাম বাপ্পি, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে আলী জাকি শাহরিয়ার, সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে রায়হান উদ্দিন, নাট্য সম্পাদক পদে রুহুল ইসলাম, ক্রীড়া সম্পাদক পদে শফিউজ্জামান শাহীন, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (ছেলে) পদে মাহাদী হাসান, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (মেয়ে) পদে লুবনা, তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক পদে রাশেদুল ইসলাম লিখন, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক পদে হাফেজ আরিফুল ইসলাম, সহ-সমাজসেবা সম্পাদক (ছেলে) পদে তৌহিদ, সহ-সমাজসেবা সম্পাদক (মেয়ে) পদে নিগার সুলতানা, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদক পদে হোসনে মোবারক, পরিবহণ ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে তানভীর।
কার্যকরী সদস্য পদে ছেলে (৩ জন) হাফেজ তরিকুল, আবু তালহা ও মহসিন। কার্যকরী সদস্য পদে মেয়ে (৩ জন) ফাবলিহা জাহান, নাবিলা বিনতে হারুন ও নুসরাত জাহা।
অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বামপন্থি সংগঠনগুলো এখনো পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেনি। তবে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) ‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’ নামে একটি প্যানেল ঘোষণা করেছে।
শাখা আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল জানান, তাদের লক্ষ্য শুধু কেন্দ্রীয় পদ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হল সংসদেও প্রার্থী দেওয়া।
এদিকে বাগছাসের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. নাজমুল ইসলাম বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে নির্বাচন কমিশন দপ্তরের সামনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, সংগঠনের ভেতরে ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়ন ও স্বজনপ্রীতির কারণে তিনি হতাশ হয়ে পদ ছাড়েন। নাজমুল জানান, তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বা অন্য কোনো প্যানেল থেকে এজিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
বাগছাসের সদস্য সচিব আবু তৌহিদ মো. সিয়াম বলেন, “আমাদের কমিটিতে ৬০ জন সদস্য, কিন্তু পদ মাত্র ২৫টি। সবাইকে রাখা সম্ভব নয়। যোগ্যদেরই প্যানেলে রাখা হয়েছে। স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সঠিক নয়।”
জাকসুর পাশাপাশি হল সংসদ নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। মোট ৪৬৭টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। এর মধ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে সর্বোচ্চ ৬০টি, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলে ৪৯টি এবং আ ফ ম কামালউদ্দিন হলে ২২টি মনোনয়ন জমা পড়েছে। মীর মশাররফ হোসেন হলে ৩০টি, মওলানা ভাসানী হলে ২৭টি, শহীদ রফিক জব্বার হলে ২১টি, বীরপ্রতীক তারামন বিবি হলে ১৭টি এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে ২২টি মনোনয়নপত্র জমা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ছাত্রী হলে যথেষ্ট সাড়া পাওয়া গেছে।
শেষ দিন শিক্ষার্থীদের জমায়েতে ক্যাম্পাসে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অনেকেই ফরম সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিকভাবে জমা দেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, বাগছাস, ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
ভিপি পদপ্রার্থী আবদুর রশিদ জিতু বলেন, “ক্যাম্পাস এখন এক উৎসবের মাঠে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে উচ্ছ্বসিত।”
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সংগঠক সোহাগী সামিয়া বলেন, “প্রশাসনের কার্যক্রম এখন পর্যন্ত সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য সন্তোষজনক।”
বাগছাসের আহ্বায়ক ও ভিপি প্রার্থী আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল জানান, তারা স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এবং অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে যাবেন না।
জুলাই আন্দোলনে আহত হয়ে আলোচিত হওয়া জিএস প্রার্থী শাকিল আলী বলেন, তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় লড়বেন।
শিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের ভিপি প্রার্থী আরিফুল্লাহ আদিব বলেন, “আমরা শুধু দলীয় নয়, নির্দলীয় প্রার্থীকেও গুরুত্ব দিয়েছি, যাতে শিক্ষার্থীরা আমাদের প্যানেলকে নিজেদের মনে করে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন পর জাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে উচ্ছ্বসিত। যদিও প্যানেলভিত্তিক রাজনীতিতে ভাঙন, সমঝোতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে। নির্বাচনের আগে সেনা মোতায়েনের আবেদন এবং নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, ২৫টি কেন্দ্রীয় পদে ২৭৩টি এবং হল সংসদে ৪৬৭টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ায় এবারের জাকসু নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।