প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: সোমবার , ১২ মে , ২০২৫
সম্প্রতি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের পক্ষশক্তিগুলোর মধ্যে বিচ্ছিন্নভঅবে উগড়ে উঠা স্লোগানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কে দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করে ব্যাখা দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তরুণদের নবগঠিত দল এনসিপি বলছে, “যেসব আপত্তিকর স্লোগান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, তার দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পক্ষটিকেই বহন করতে হবে।… যারা ১৯৭১ সালে এই জনপদের মানুষের জনযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছিল এবং যাদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে, আমরা চাই তারা নিজেদের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান জাতির সামনে ব্যাখ্যা করে জাতীয় সমঝোতা ও ঐক্যকে সুদৃঢ় করবে এবং চব্বিশের অভ্যুত্থানের জনআকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নে সহযোগী হবে।”
আওয়ামী লীগের বিচার ও দলটিকে নিষিদ্ধের দাবিতে এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লার ডাকে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের বেশ কয়েকটি গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টা থেকে রাজপথ অবরোধ শুরু করে। প্রথমে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা, পরে মিন্টোরোডের প্রবেশমুখের ফোয়ারা এবং সবশেষ গত শুক্রবার বিকাল থেকে শাহবাগ চত্বর দখল করে আন্দোলন করে তারা।
আন্দোলনে এনসিপির পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামি, ছাত্রশিবির, আপ বাংলাদেশসহ আরও কিছু সংগঠনকে দেখা গেছে। শনিবার রাতেই সরকার উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকের সিদ্ধান্তের আলোকে দাবি পূরণের পথ সুগম হলে আন্দোলনে সফলভাবে শেষ হয়।
তবে দ্বিতীয় দিনে শাহবাগের গণজমায়েত থেকে- “গোলাম আজমের বাংলায়- আওয়ামী লীগের ঠাঁই নাই। সাঈদীর বাংলায়, আওয়ামী লীগের ঠাঁই নাই।.. এই ধরনের স্লোগান উচ্চারিত হওয়ার বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনের বিজয় ঘোষণার প্রাক্কালে এনসিপি নেতারা জাতীয় সঙ্গীত কণ্ঠে তুললে ধর্মীয় লেবাসধারী কিছু যুবক বাধা দিতে চেষ্টা করে এবং ব্যর্থ হয়ে ‘ভুয়া’ ‘ভুয়া’ স্লোগান দেয়।
এই ঘটনা গড়িয়েছে আরও বহুদূর। তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম প্রসঙ্গ উল্লেখ না করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জামায়াত মতাদর্শের সঙ্গে তিক্ত ভাষায় সমালোচনা করেছেন এবং তাদেরকে শোধরানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তার একটি কড়া বক্তব্যের স্ক্রিনশট সামাজিক মাধ্যমে ঘুরছে যা নিজের ফেইসবুকে তোলার কিছুক্ষণ পর নামিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন।
জামায়াত নেতাদের পক্ষ থেকেও বিচ্ছিন্নভাবে মাহফুজ আলমের কড়া সমালোচনা করা করা হচ্ছে। উপদেষ্টা পরিষদে থাকা অবস্থায় একটি দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মাহফুজ শপথ ভঙ্গ করছেন কিনা সেই প্রশ্ন তুলেছেন শাহবাগ থানা জামায়াতের আমির; যার নামও মাহফুজ।
তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ’র’ এর হয়ে কাজ করছেন কিনা যমুনা টিভির এক অনুষ্ঠানে এমন সন্দেহও প্রকাশ করেছেন এই জামায়ত নেতা।
বিতর্কের এমন পরিস্থিতিতে এনসিপির পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, “আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে আওয়ামী লীগের দলগত বিচারের বিধান যুক্ত করা, এবং জুলাইয়ের ঘোষণাপত্র জারি করার দাবিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মত, পক্ষ এবং সাধারণ ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করলেও একটি পক্ষ সচেতনভাবে দলীয় স্লোগান এবং বাংলাদেশের জনগণের ঐতিহাসিক সংগ্রাম বিরোধী স্লোগান দিয়েছে। যা জুলাই পরবর্তী সময়ে সাম্প্রতিক আন্দোলনে জাতীয় ঐক্য নবায়নের সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টিতে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছি জাতীয় নাগরিক পার্টি–এনসিপি’র কোনো সদস্য সাম্প্রতিক আন্দোলনে দলীয় স্লোগান কিংবা এই জনপদের মানুষের সংগ্রাম ও ইতিহাসবিরোধী কোনো স্লোগান দেয়নি।
“ফলে যেসব আপত্তিকর স্লোগান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, তার দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পক্ষটিকেই বহন করতে হবে। এনসিপিকে এর সাথে জড়ানো সম্পূর্ণ অহেতুক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। বরং এনসিপি সদস্যদের বক্তৃতা ও স্লোগানে এই জনপদের মানুষের ঐতিহাসিক সংগ্রামের অধ্যায়সমূহ তথা ১৯৪৭, ১৯৭১, এবং ২০২৪ এর প্রতিফলন ছিল।”
জাতীয় সঙ্গীত বিতর্ক সম্পর্কে এনসিপি বলছে, “আন্দোলনকারীরা জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনার সময় একটি পক্ষ আপত্তি জানালেও তারা দৃঢ়তার সাথে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে।”
জাতীয় নাগরিক পার্টি - এনসিপি মনে করে, “বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহাসিক সংগ্রামের অধ্যায় তথা, ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪ এর যথাযথ স্বীকৃতি এবং মর্যাদা বাংলাদেশে রাজনীতি করার পূর্বশর্ত। যারা ১৯৭১ সালে এই জনপদের মানুষের জনযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছিল এবং যাদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে, আমরা চাই তারা নিজেদের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান জাতির সামনে ব্যাখ্যা করে জাতীয় সমঝোতা ও ঐক্যকে সুদৃঢ় করবে এবং চব্বিশের অভ্যুত্থানের জনআকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নে সহযোগী হবে।
বিগত ফ্যাসিবাদী জমানায় নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে বাংলাদেশের নাগরিকদের পক্ষে চব্বিশের অভ্যুত্থানে যারা ভূমিকা পালন করেছেন, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাদেরকে আবশ্যিকভাবে ‘বাংলাদেশপন্থি’ ভূমিকা পালন করে যেতে হবে।”
এনসিপি মনে করে, “কোনো রাজনৈতিক দল বা পক্ষের পূর্বেকার রাজনৈতিক অবস্থান বা আদর্শের কারণে ইতিপূর্বের বিভাজন ও অনৈক্যের রাজনীতির সূত্রপাত ঘটলে, সংশ্লিষ্ট দল বা পক্ষের দায় রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের সামনে নিজেদের সুস্পষ্ট অবস্থান ব্যাখ্যা করে জাতীয় ঐক্যের পথে হাঁটার। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যকার বৃহত্তর ঐক্যের মাধ্যমেই কেবল মুজিববাদকে সামগ্রিকভাবে পরাস্ত করা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি।”