ঢাবি প্রতিনিধি প্রকাশিত: বুধবার , ২০ আগস্ট , ২০২৫
দীর্ঘ ছয় বছর পর আবারও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাসে ইতোমধ্যেই উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে জমে উঠেছে প্রচার-প্রচারণা।
এবারের নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির, গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট, ছাত্র অধিকার পরিষদসহ মোট আটটি প্যানেল অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে চারটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ইতোমধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে। বাকিগুলোও শিগগিরই ঘোষণা করবে বলে জানা গেছে।
ডাকসুর ২৮টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য এ বছর মোট ৬৫৮টি মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে ১৮টি হলে হল সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৪২৭টি ফরম। সর্বাধিক ফরম সংগ্রহ হয়েছে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে—মোট ১১২টি। সবচেয়ে কম বিক্রি হয়েছে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে—৩৩টি।
প্রার্থীরা একাধিক মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে পারলেও শেষ পর্যন্ত একটি পদেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ২০ আগস্ট, আর ২৫ আগস্ট বিকালে প্রকাশ করা হবে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ও ক্যাম্পাস চত্বরে সম্ভাব্য প্রার্থীরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। কেউ আবার প্রচারণার অংশ হিসেবে ফটোকার্ড, পোস্টার ও ভিডিও প্রচার করছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। নির্বাচনের খবর প্রকাশের পর থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীরাও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন। অনেকেই বলছেন, প্যানেলভিত্তিক রাজনীতি নয়, যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেবেন তারা।
শিক্ষার্থী আরিফুর রহমানের ভাষায়, “জুলাই আন্দোলনে যারা সামনে থেকে লড়েছেন এবং ৫ আগস্টের পর কোনো অনিয়মে জড়াননি, তারাই আমাদের কাছে যোগ্য প্রার্থী।” একইভাবে শিক্ষার্থী আছিয়া খাতুন জানান, “আমরা কোনো বিশেষ সংগঠনকে নয়, যোগ্য ব্যক্তিকেই ভোট দিতে চাই। যারা ছাত্র রাজনীতিকে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক রাখবেন, তারাই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য।”
সবার আগে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করে আলোচনায় এসেছে ইসলামী ছাত্রশিবির। তাদের ঘোষিত প্যানেলে ভিপি পদে রয়েছেন আবু সাদিক কায়েম, জিএস পদে এসএম ফরহাদ এবং এজিএস পদে মহিউদ্দিন খান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দীর্ঘদিন পর শিবিরের প্যানেলে স্থান পেয়েছেন চার নারী শিক্ষার্থী, জুলাই আন্দোলনে আহত এক শিক্ষার্থী এবং একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী। প্যানেলের বাকি পদগুলোতে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের সক্রিয় নেতারা মনোনয়ন পেয়েছেন।
গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটও ঘোষণা করেছে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল। তাদের ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ নামের প্যানেল থেকে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি, জিএস পদে মেঘমল্লার বসু এবং এজিএস পদে জাবির আহমেদ জুবেল। প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন বিভাগ থেকে নতুন প্রজন্মের নেতৃবৃন্দকে। তাদের মূল প্রতিশ্রুতি হলো ছাত্র রাজনীতিকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনা এবং বৈষম্য দূর করা।
ছাত্র অধিকার পরিষদও ঘোষণা করেছে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল। তাদের স্লোগান—“ভোট ফর চেঞ্জ”। এই প্যানেল থেকে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন সংগঠনের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা এবং জিএস পদে লড়বেন সাবিনা ইয়াসমিন। এজিএস পদে মনোনয়ন পেয়েছেন রাকিবুল ইসলাম। সংগঠনটির নেতাদের দাবি, তারা পরিবর্তনের রাজনীতি করতে চায়। ইশতেহারে থাকছে শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এখনো তাদের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেনি। তবে একাধিক নেতা ভিপি, জিএস ও সম্পাদকীয় পদে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। ছাত্রদলের নেতাদের দাবি, কে কোন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, সেটি নির্ধারণ করবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় ভিপি পদে আবিদুল ইসলাম খান ও কাউসারের নাম শোনা যাচ্ছে।
এছাড়াও বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন, স্বতন্ত্র ঐক্যজোট ও ‘ডিইউ ফার্স্ট’ নামের কয়েকটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। এর মধ্যে উমামা ফাতেমার নেতৃত্বে স্বতন্ত্র ঐক্যজোট, মাহিন সরকারের নেতৃত্বে ‘ডিইউ ফার্স্ট’ এবং ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের ‘সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ’ আলাদা প্যানেল ঘোষণা করেছে।
এদিকে নির্বাচনী প্রস্তুতির মধ্যেই ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বিতর্কও শুরু হয়েছে। মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় একদিন বাড়ানোয় ছাত্রদলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ কয়েকটি সংগঠন। শিবিরের নেতাদের দাবি, প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকলে নির্বাচন আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা—এবারের ডাকসু নির্বাচন হবে স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও সহিংসতামুক্ত। তারা বলছেন, যেই-ই নির্বাচিত হোন না কেন, ছাত্র সংসদ যেন কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কল্যাণে কাজ করে।