প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: শুক্রবার , ১১ এপ্রিল , ২০২৫
মডেল মেঘনা আলমকে বাসা থেকে আটকের দীর্ঘ সময় পর বিশেষ ক্ষমতা আইনে ৩০ দিনের আটকাদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।
বুধবার সন্ধ্যায় আটকের পর বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে তাকে আদালতে হাজির করার তথ্য দিয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। দীর্ঘ সময় তার হদিস না থাকায় তাকে পুলিশ পরিচয়ে অপহরণের অভিযোগও ওঠে।
শুক্রবার দুপুরে এসে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বলেছে, “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্পর্ক মিথ্যাচার ছড়ানোর মাধ্যমে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক অবনতির অপচেষ্টা করা এবং দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে মেঘনা আলমকে সকল আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়েছে।”
তবে, সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ উত্থাপন না করে বিশেষ ক্ষমতা আইনের প্রয়োগ নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
বুধবার রাতে মেঘনা আলমকে আটকের জন্য পুলিশ যখন তার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসা যায়, তখন ফেসবুক লাইভে সংযুক্ত ছিলেন সাবেক এই মিস আর্থ বাংলাদেশ।
আটকের পর ঢাকায় সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ঈসা ইউসুফ ঈসা আলদুহাইলানকে নিয়ে মেঘনার দেওয়া কয়েকটি ফেসবুক পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রদূতের ‘স্ত্রীকে’ পাঠানো মেঘনার ক্ষুদে বার্তাও রয়েছে।
মডেল ও মিস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মেঘনা আলম ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর মিস আর্থ বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন।
লাইভ ভিডিওতে আটকের পূর্বাপর
বুধবার সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে এসে মেঘনা আলম বলছিলেন, পুলিশ পরিচয় দিয়ে তার বাসায় এসেছে অস্ত্রধারীরা। তারা ‘দরজা ভাঙ্গার’ চেষ্টা করছে। এর মধ্যে দরজার ‘ভিউ ফাইন্ডারে’ দেখে তাদের সঙ্গে কথাও বলছিলেন এই মডেল।
ওই প্রান্ত থেকে নানা অনুরোধের পরও কোনোভাবে দরজা না খোলার কথা বলেন। লাইভে থাকাবস্থায় ‘আইনজীবী’সহ কয়েকজনের সঙ্গে ফোনালাপও করেন তিনি। লাইভে তার দেওযা বক্তব্য অনুযায়ী, ওই বাসার মালিকও পুলিশের সঙ্গে ছিলেন।
এক পর্যায়ে পুলিশ ‘দরজা ভেঙ্গে’ তার বাসার ভেতরে ঢোকার পরপরই লাইভটি বন্ধ হয়ে যায়। ১২ মিনিটের বেশি সময় ধরে চলা ওই লাইভটি এক পর্যায়ে ডিলিটও হয়ে যায়।
ওই লাইভে বাসায় আসা পুলিশ সদস্যদেরকে ‘ভুয়া’ প্রমাণের চেষ্টা চালান মেঘনা আলম এবং এর জন্য সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসাকে দায়ী করেন তিনি। তার কথা অনুযায়ী, একই ঘটনায় আরও কয়েকজনকে পুলিশ আগেই আটক করেছে।
বুধবার সন্ধ্যার জন্য বৃহস্পতিবার রাত ১০টা পর্যন্ত এই মডেল-অভিনেত্রীর আটকের বিষয়ে পুলিশের তরফে কোনো বক্তব্য আসেনি। ওই সময়ে তাকে আদালতে উঠিয়ে কারাগারে পাঠানোর পর জানাজানি হয়, বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাকে ৩০ দিনের হেফাজতে রাখা হবে।
মেঘনা আলমকে আটক বা গ্রেপ্তারের কোনো তথ্য না আসায়, তাকে অপহরণের কথা ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এর জবাবে শুক্রবার দেওয়া বিবৃতিতে ডিএমপি বলেছে, “তাকে অপহরণ করার অভিযোগ সঠিক নয়। তথাপি আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার তার রয়েছে।”
ডিটেনশন আইনে সরকার কোনো ব্যক্তিকে আদালতের আনুষ্ঠানিক বিচার ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটক বা বন্দি করতে পারে। এ ধরনের আইন সাধারণত জননিরাপত্তা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে প্রয়োগ করা হয়।
কারাগারে প্রেরণ, আইন কী বলে
পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে মেঘনা আলমকে ৩০ দিনের আটকাদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত।
তার বিরুদ্ধে ওই আদেশের তথ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেছেন, বিশেষ ক্ষমতা আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ক্ষতিকর কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, সেক্ষেত্রে ক্ষতিকর কাজ থেকে তাকে নিবৃত্ত রাখার জন্য আটক করতে পারেন।
“মডেল মেঘনা আলম ক্ষতিকর কাজের সঙ্গে যুক্ত। যে কারণে তাকে গতকাল রাতে ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করে আটক রাখার আবেদন করে পুলিশ। আদালত তাকে ৩০ দিনের আটক রাখার আদেশ দেন।”
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী, ক্ষতিকর কাজ থেকে নিবৃত্ত রাখার জন্য সরকার যেকোনো ব্যক্তিকে আটক রাখার আদেশ দিতে পারবেন। আবার এই আইনের ৩(২) ধারা অনুযায়ী, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যদি সন্তুষ্ট হন এই আইনের নির্দিষ্ট ধারার ক্ষতিকর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত তাহলে ওই ব্যক্তিকে আটক রাখার আদেশ দেবেন।
বিশেষ ক্ষমতা আইনের যেসব ক্ষতিকর কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিকে আটক আদেশ দেওয়া যায়, সেগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বা প্রতিরক্ষার ক্ষতি করা, বাংলাদেশের সঙ্গে বিদেশি রাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সংরক্ষণের ক্ষতি করা, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বা জননিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার ক্ষতি করা, বিভিন্ন সম্প্রদায়, শ্রেণি বা গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণাবোধ বা উত্তেজনা সৃষ্টি করা এবং আইনের শাসন বা আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করা বা উৎসাহ প্রদান করা বা উত্তেজিত করা।
ক্ষতিকর আরও কাজ হচ্ছে জনসাধারণের জন্য অত্যাবশ্যক সেবা বা অত্যাবশ্যক দ্রব্যাদি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করা, জনসাধারণ বা কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি বা আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বা আর্থিক ক্ষতি করা।
রাষ্ট্রদূতকে নিয়ে কী লিখেছেন মেঘনা
সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা ইউসুফকে নিয়ে মেঘনা আলমের দেওয়া আগের কয়েকটি পোস্টের স্ক্রিনশট ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
ওই পোস্টের একটিতে তিনি লেখেন, “বাংলাদেশে সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা ইউসুফ পুলিশ দিয়ে মানুষকে তুলে নিচ্ছে; সত্যটা যাতে সামাজিক মাধ্যমে না লিখি, সেজন্য ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। তারা আমাকে হুমকি দিচ্ছে, আমাদের সরকার তার সঙ্গে আছে। এটা আমার নিরাপত্তার বিষয়।
“গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি করে একজন ফোন করেছে এবং আমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছে। এখনই তিন ব্যক্তি পুলিশ হেফাজতে আছে।”
২৫ মার্চে দেওয়া আরেকটি পোস্টে রাষ্ট্রদূত ঈসার সঙ্গে ছবি প্রকাশ করে তাদের আংটি বিনিময়ের কথাও লেখেন মেঘনা আলম।