প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: শুক্রবার , ৭ ফেব্রুয়ারি , ২০২৫
জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণকে ক্ষমতার প্রকৃত অংশিদার করতে জাতীয় নাগরিক কমিটিকে নতুন রাজনীতি নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন প্রাবন্ধিক, চিন্তক ও কবি ফরহাদ মজহার।
পরাজিত ফ্যাসিবাদের বিপরীতে ভিন্নরূপে নতুন ফ্যাসিবাদ যেন মাথাচাড়া না দেয় সেই দিকেও সতর্ক করেছেন তিনি।
নতুন রাজনৈতিক দল গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ২৪টি থানার প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘প্রতিনিধি সভার’ আয়োজন করে নাগরিক কমিটি। ফরহাদ মজহার ছিলেন অনুষ্ঠানে অতিথি আলোচক।
নাগরিক কমিটির মাধ্যমে অভ্যুত্থানের নেতাদের নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, “সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের কারণে যেই গণঅভ্যুত্থান সফল করা যায়নি, সেই গণঅভ্যুত্থানকে পূর্ণ করবার জন্য বা পরিপূর্ণ গণঅভ্যত্থানের মধ্য দিয়ে গণসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং নতুন গঠনতন্ত্র প্রণোয়ন করবার রাজনীতি আগামী দিনে করতে হবে।”
নতুন যে রাজনৈতিক দল গঠন করা হবে সেটিকে বিপ্লবী চেতনা ধারণ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “জনগণ আর দল এক নয়। আপনারা একটা দল করতে নেমেছেন। কিন্তু আমি সন্দেহ করবো, আপনারা কী আরেকটা বিএনপি বানাবেন? নাকি সত্যিকারের গণঅভ্যুত্থানটা পূর্ণ করার সাংগঠনিক শক্তি হাজির করবেন। যদি আরেকটি নির্বাচনবাদী দল করেন, যদি নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদলাতে চান, সরকার গঠন করতে চান এটা হবে দুঃস্বপ্ন।
“ইতোমধ্যেই রাষ্ট্র নিজেকে সংহত করছে। যারা গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত নয় তারা এই রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। যারা ৫ অগাস্টে পরাজয় বরণ করেছিল তারা নতুন করে নিজেকে সংহত করছে।”
“এই রাজনীতির জন্য জনগণের মধ্যে ঐক্য তৈরি হবে। গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষার জন্য অবিলম্বে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। সেটা যেই নামই দেওয়া হোক না কেন, কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। কারণ গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি অতি দ্রুত মুছে ফেলা হবে। আপনাদের কাঁধে অনেক অনেক দায়। তরুণদের রাজনৈতিক দল করবার প্রক্রিয়াটা অবিলম্বে শুরু করা দরকার। নতুন ঐতিহাসিক মুহূর্ত শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়; কারণ ৫ অগাস্টের ঘটনা দক্ষিণ এশিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।”
আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিবাদ হিসাবে চিহ্নত করার পর ফ্যাসিবাদের বিলোপ হয়েছে বলে অনেকে দাবি করলেও বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে ফরহাদ মজহার বলেন, “ফ্যাসিবাদের বিলোপের কথা বলছেন- ফ্যাসিবাদ শুধুমাত্র একটা মতাদর্শ নয়; এটা একই সঙ্গে একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা, একই সঙ্গে এটা একটা ফ্যাসিস্ট শক্তি। এই তিনটাকে আলাদা করে আগামী দিনের লড়াই ও রণনীতি প্রণয়ন করতে হবে।
ফ্যাসিবাদ হচ্ছে মতাদর্শ যেখানে ব্যক্তি মনে করে যে তার তত্ত্বটা একমাত্র সত্য তত্ত্ব, আর বাকিদেরটা মিথ্যা। আপনি যদি সেক্যুলার হন, তাহলে ইসলামিস্টরা মিথ্যা। আবার ইসলামিস্ট হলে সেক্যুলাররা মিথ্যা, আপনি যদি আদিবাসী হন, তাহলে বাঙালিরা মিথ্যা আর যদি বাঙালি জাতিবাদী হন তাহলে বিভিন্ন রকম ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা মিথ্যা। আজকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ হয়তো উৎখাত হতে চলেছে, পাশাপাশি ধর্মীয় জাতিবাদ সেটা হিন্দুত্ববাদী হোক আর ইসলামপন্থি হোক এটাও কিন্তু ফ্যাসিবাদের একটা রূপ। এগুলাকে কিন্তু মোকাবেলা করতে হবে। আপনারা যে রাজনৈতিক দল করতে যাচ্ছেন এর লক্ষ্য হচ্ছে সব ধরনের ফ্যাসিবাদের বিপরীতে দাঁড়ানো।”
রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তন নিশ্চিত করতে এর আগে দুই বার ব্যহত হওয়া জুলাই ঘোষণা ও সংবিধান বাতিলের উদ্যোগ আবারও নিতে বলেন ফরহাদ মজহার।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র কায়েম হয়, পপুলার সভরেন্টি বা গণসার্বভৌমত্ব কয়েম হচ্ছে। গণসার্বভৌমত্ব হচ্ছে জনগণই ক্ষমতার অধিকারী।
গণঅভ্যুত্থানের সরকার গঠন করার দরকার ছিল, কিন্তু আপনারা ভুল করে ফেলছেন। তরুণদের এখন একটা ঘোষণা দেওয়া দরকার। ৫ অগাস্টে ঘোষণা দেওয়ার দরকার ছিল; দেরিতে হলেও সেই ঘোষণা দেওয়া যায়। জনগণ চাইলে অবশ্যই জনগণ ঘোষণা দিতে পারে। এই রাষ্ট্রের বা ডক্টর ইউনূসের কোনো অধিকার নাই ঘোষণাকে বন্ধ করার। এই ঘোষণা না দেওয়ার কোনো অধিকারও আপনাদের নাই; কিন্তু আপনারা সেটা করেছেন। প্রক্লেমেশন একটা ঐতিহাসিক দলিল একটা আইনি দলিল। ডক্টর ইউনূস অবশ্যই ব্যর্থ হবেন। এই সরকার অনিবার্যভাবেই ব্যর্থ হতে বাধ্য। যেহেতু গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটে এই সরকার নাই।”
সম্প্রতি ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন এর সঙ্গে ভূরাজনীতির সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা হঠাৎ করে বক্তৃতা দেয়নি। দিল্লি প্রথম দিন থেকে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করার চেষ্টা করছে। বন্যা থেকে শুরু করে খাদ্য ও অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর কাজটা তারা করেছে। কিন্তু এখন তার যে পদক্ষেপ এটা ট্রাম্প আসার পরে। ১২ ফেব্রুয়ারি যে, টাম্প-নরেন্দ্র মোদি বৈঠক তার আগে এটা ছিল লিটমাস টেস্ট। আপনারা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখান সেটা তারা দেখতে চেয়েছিল।
আপনারা যারা নিন্দা করেছেন, বলেছেন যে আমরা ভাঙার রাজনীতি চাই না। আমি আপনাদের সঙ্গে একমত, কিন্তু আমার একটা কথা আছে। ভাঙার রাজনীতি একই সঙ্গে গড়ারও রাজনীতি।
অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর ভুল ধরিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আপনারা চুপ্পুকে পদত্যাগে বাধ্য করতে পারেননি। চুপ্পুকে পদত্যাগ করতে হবে। ৭২ সালের সংবিধান বাতির করতে হবে। কারণ ওটা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করবো। এই ঘোষণার ভিত্তিতে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। সেই মুক্তিযুদ্ধ ছিনতাই করে নিয়ে গেছে দিল্লি। তার জবাব আমরা এতো বছর পরে ৫ অগাস্টে দিতে পেরেছি। কিন্তু আমরা সংবিধান বাতিল করতে পারি নাই। নতুন গঠনতান্ত্রিক পক্রিয়া শুরু করতে পারি নাই। আমরা কমিশন দিয়ে কাজ চালাবার চেষ্টা করছি। এই ধরনের ইল্যুশনে যদি আপনারা আক্রান্ত থাকেন, আপনারা জীবনে কিছু করতে পারবেন না। এলিটদের অভিজাত শ্রেণিকে যারা আওয়ামী লীগের আমলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুবিধা ভোগী তাদেরকে ধরে ধরে এনে যদি আপনার কমিশন বানান এদের দিয়ে আপনারা কী করবে। বাংলাদেশটা তো নতুন করে গঠন করতে হবে।
শব্দ হিসাবে ‘সংবিধান’ না বলে ‘গঠনতন্ত্র’ শব্দটা ব্যবহারের ওপর জোর দেন এই তাত্ত্বিক। সেটা করবে জনগণ, সেটা ওয়ার অন টেররের সহযোগিতার এটা করবে না।
“৫ অগাস্টের পর যারা মাজার ভাঙা শুরু করলো, এরা কারা? এদেরকে মোসাদ-র টাকা দেয়। মাজারের ব্যাপারে আমাদের আপত্তি থাকতে পারে। বহু হোটেলে গাজা খাওয়া হয়, ইয়াবা খাওয়া হয় ওদেরকে কিচ্ছু করতে পারেন না। গিয়ে লাগছেন গরীব মানুষগুলোর ওপর। নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে বড় কোনো প্রতিবাদ দেখতে পাইনি।”
প্রতিনিধিদের অভিজ্ঞতা
বিকাল সাড়ে তিনটায় শুরু হওয়া সভা চলে রাত ৯টারও বেশি সময় ধরে। প্রথমে বিভিন্ন থানা থেকে আসা প্রতিনিধিরা নাগরিক কমিটির কাজ করতে গিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
অধিকাংশ প্রতিনিধির বক্তব্যে উঠে আসে বিএনপিকর্মীদের চাঁদাবাজী, থানা পুলিশের অসহযোগিতা ও জনভোগান্তির কথা।
লালবাগ থানার প্রতিনিধি সালমা আক্তার বলেন, “আমরা যেমন ঝামেলার সম্মুখীন হচ্ছি, আবার মাঠে অনেক সাড়া পাচ্ছি। আমরা যখন মানুষের কাছে আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে জানতে চাচ্ছি তারা খুশি হচ্ছে।”
চকবাজার থানার ফারজানা আহমেদ বলেন, “বিপ্লব হয়ে গেলেও আমরা ঘরে ফিরিনি। আমরা এখনও ঘরে ফিরিনি। সবাই শেখ হাসিনা ক্ষমা করলেও আমি ক্ষমা করব না। আওয়ামী লীগ নামের কোনো দলকে বাংলাদেশে রাজনীতি করতে দেব না।”
মুগদা থানা প্রতিনিধি শাওন আহমেদ বলেন, আন্দোলনের সময় যেভাবে একত্রিত ছিলাম সামনেও দেশ গঠনের কাজে ঐক্যবদ্ধ থেকে কাজ করতে চাই।
শ্যামপুর থানার প্রতিনিধি হাসানুল ইসলাম রায়হান বলেন, “কুইক রেসপন্স টিম গঠনের দাবি জানাচ্ছি। নাগরিক সমস্যার সমাধান করতে না পারলে আমাদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা কমে যাবে। রাস্তাঘাট, এনআইডিসহ অনেক সরকারি সেবা পেতে অনেক ভোগান্তিতে পড়ে।”
সাদেকুল ইসলাম নামের একজন বলেন, “নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কেন্দ্রিক রাজনীতি যেন নাগরিক কমিটি করে। হরতাল অবরোধ কেন্দ্রিক রাজনীতি যেন নাগরিক কমিটি চালু করে।”
কেরানীগঞ্জ থানা প্রতিনিধি সিফাত মিম বলেন, প্রশাসন এখনও সহযোগিতা করছে না। এখনই তারা আমাদের প্রতিপক্ষ মনে করছে। আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ থেকে এসব প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হবে।
বংশাল থানা প্রতিনিধি নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, “আমার এলাকার যানজট নিরসন ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধে নাগরিক কমিটি যেন পদক্ষেপ নেয়। রাস্তঘাটে আইন শৃংখলা বাহিনীর প্রচুর অবহেলা আছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
কামরাঙ্গীরচর থানার প্রতিনিধি সালাউদ্দিন বলেন, আন্দোলনকারীদের টিজ করার জন্য তারাঐক্যবদ্ধ রয়েছে। সেখানে প্রতিনিয়ত চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রে আমাদেরকে কেন্দ্র থেকে সহযোগিতা দেওয়ার জন্য একটা সেল গঠন করা দরকার। নদী দখল ও মাদকের ব্যাপক তৎপরতা চলছে।
খিলগাঁও থানার প্রতিনিধি হাসনাত, সবুজবাগ থানা প্রতিনিধি ফারুক হোসেন, হাজারীবাগ থানার প্রতিনিধি সাদমান সাকিব, মতিঝিল থানার প্রতিনিধি আমাজ উদ্দিন, যাত্রাবাড়ী থানার প্রতিনিধি ইয়াসমিন জাহান, কেন্দ্রীয় সংগঠক মশিউর রহমান, কেন্দ্রীয় সদস্য খান মোহাম্মদ মোরসালিন, রাকিব হাসান বক্তব্য রাখেন।
জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখপাত্র সামান্তা শারমিন, মুখ্য সংগঠন সারজিস আলম শেষ পর্বের আলোচনা ও প্রশ্নোত্তরে অংশ নেন।