প্রতিনিধি, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: সোমবার , ৩১ মার্চ , ২০২৫
নতুন বাংলাদেশের প্রথম ঈদ উৎসবে বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস আর আনন্দে মেতেছেন রাজধানীবাসী।
প্রাচীন বাংলার হারানো ঐতিহ্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি আর ঈদ বিনোদনের লুপ্ত অনুষঙ্গগুলো ফিরে এসেছিল ঢাকার আগারগাঁও পুরাতন বাণিজ্য মেলা মাঠকে ঘিরে।
গত ৫ অগাস্ট গণ-আন্দোলনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে ১৫ বছরের সাজানো পোক্ত ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। অন্তর্বর্তী সময়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মাদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবার ঈদ এল।
রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা হাসিবুল ইসলাম তার দুই সন্তান ও স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় আগারগাঁও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করতে আসেন। নামাজের সময় যত এগিয়ে আসছিল, তিনি ঈদের জামায়াতে মানুষের বিপুল উপস্থিতি দেখে বিস্মিত হচ্ছিলেন।
সকাল সাড়ে ৮টায় নামাজ শেষে পুরো পরিবার নিয়ে ঈদ আনন্দ মিছিলে যোগ দেন। মিছিলে তার ৮ ও ৬ বছরের দুই শিশু নেচে নেচে ঈদের স্লোগান দিচ্ছিল এবং পুরো আয়োজন উপভোগ করছিল।
এই সময় হাসিবুল ইসলাম ও তার সন্তানদের সঙ্গে কথা হয়।
তারা জানান, এমন ঈদ আয়োজনে অংশ নিতে পেরে গ্রামের ঈদের আনন্দ না পাওয়ার দুঃখ ভুলে গেছেন। শিশুরাও রঙিন আয়োজনের আনন্দে মেতে ওঠে।
“আমি আমার জীবনে এমন ঈদ আয়োজন দেখিনি। শুনেছি, মুঘল আমলে এমন ঈদ আনন্দ মিছিল হতো। আজ মুঘল আমলের সাজে ঈদ উদযাপনে শামিল হয়ে মনে হচ্ছে, বাঙালির সেই ঐতিহ্যের দিনগুলোতে ফিরে গেছি। আগে ঈদ মানেই ছিল সকালে নামাজ শেষে বাসায় গিয়ে খাওয়া, তারপর বিকেলে বাচ্চাদের নিয়ে চিড়িয়াখানায় ঘুরতে যাওয়া। কিন্তু এবার এত মানুষের সমাগমে শিশুরাও প্রাণ ভরে আনন্দ করছে,” বলেন হাসিবুল ইসলাম।
ঈদ শোভাযাত্রায় সুসজ্জিত ঘোড়া, ঘোড়ার গাড়ি, মহিষের গাড়ি আর নানা রঙের সাজ দেখে সবাই ছিল উচ্ছ্বসিত।
হাসিবুল বলেন, “বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নানা অজুহাতে আমাদের ধর্মীয় উৎসবগুলো ঠিকভাবে পালন করতে দেওয়া হতো না। এবার বুকভরে নিরাপত্তার সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে পারছি।”
এবারই প্রথম আগারগাঁওয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মাঠে ঈদের জামাত আয়োজন করা হয়।
আয়োজক ডিএনসিসি এত মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়টি কল্পনাও করেনি। নামাজের জন্য নির্ধারিত প্যান্ডেলের তুলনায় ৩-৪ গুণ বেশি জায়গায় মানুষের সমাগম ঘটে।
নামাজ শেষে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে শুরু হয় ঈদ আনন্দ মিছিল, যা বেগম রোকেয়া সরণি হয়ে খামারবাড়ি ঘুরে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে শেষ হয়। সেখানে আয়োজন করা হয় এক বিশাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। এছাড়া, আগারগাঁও চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ২০০টিরও বেশি স্টল নিয়ে বসেছে ঈদ মেলা। এতে খাবার, পোশাক, প্রসাধনীসহ নানা ধরনের পণ্যের স্টল রয়েছে। মেলা চলবে মঙ্গলবার পর্যন্ত।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিল্পীরা 'ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ...' গানটি গাওয়া শুরু করতেই হাজারো মানুষের কণ্ঠে মুখরিত হয়ে ওঠে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। সবাই প্রাণ খুলে গান গেয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
ঈদের আয়োজনে অংশ নেওয়া সুমাইয়া বেগম বলেন, “এই আয়োজনের কথা দুদিন আগে শুনেই বন্ধুরা মিলে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। তাই সকাল থেকেই আছি। পুরো রাস্তা জুড়ে ঈদের স্লোগান দিয়েছি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গেয়েছি। মনে হচ্ছে, জীবনে প্রথমবার প্রাণবন্ত ঈদ উদযাপন করছি।”
অনুষ্ঠানে আসা সনাতন ধর্মাবলম্বী কণিকা রাণী বলেন, “বাচ্চাদের নিয়ে ঈদ আনন্দ মিছিলে এসেছি। উৎসবে এমন আয়োজন হলে ধর্মীয় কোনো ভেদাভেদ দেখি না। বরং আমরা শাঁখা-সিঁদুর পরে এলেও মুসলিমরা আমাদের উৎসাহ দিয়েছেন। এমন বাংলাদেশই সবাই দেখতে চায়। আমরা কোনো ধরনের শঙ্কা অনুভব করছি না।”