প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: শনিবার , ৪ অক্টোবর , ২০২৫
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষক এখনো উচ্চতর ডিগ্রি ছাড়া পাঠদান করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রায় ৫৬ শতাংশ শিক্ষক কোনো উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেননি।
বাকি অংশের মধ্যে ৩৮ শতাংশের পিএইচডি ও ৬ শতাংশের এমফিল বা সমমানের ডিগ্রি রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, যোগ্য শিক্ষক স্বল্পতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণাধর্মী পাঠদানের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। অধিকাংশ শিক্ষক উচ্চতর ডিগ্রিহীন থাকায় শিক্ষার্থীদের গবেষণামূলক চিন্তা ও কাজের দিকনির্দেশনা দেওয়া তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক নিয়োগের প্রাথমিক ধাপে পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করার দাবি উঠলেও তা কার্যকর হয়নি।
বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএইচডি বাধ্যতামূলক নয়। স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর শেষ করেই অনেকেই শিক্ষকতায় আসছেন। কিন্তু স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণাভিত্তিক পাঠদান ও দক্ষতা গড়ে তোলা—এ দুটি ক্ষেত্রে অনেকেই দুর্বল বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষার মানও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।
তবে পদোন্নতিতে এখন পিএইচডি ডিগ্রি ও স্বীকৃত জার্নালে গবেষণা প্রকাশনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৩ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পিএইচডি বাধ্যতামূলক করেছে। বিশেষজ্ঞদের মত, বিশ্বের অনেক দেশে শুধু পিএইচডি নয়, পোস্টডক্টরাল গবেষণাও শিক্ষক নিয়োগের পূর্বশর্ত। তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অন্তত প্রাথমিক পদে পিএইচডি বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি।
ইউজিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে ৪৮ লাখ ২১ হাজার ১৬৫ জন শিক্ষার্থী। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ৪৪ লাখের কিছু বেশি। এক বছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, তবে ছাত্রীর হার কমেছে। বর্তমানে মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫৩ শতাংশ পুরুষ, আর ৪৭ শতাংশ নারী।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা ২ হাজার ২৫৭টি কলেজে পড়ছেন প্রায় ৩৪ লাখ শিক্ষার্থী, যা দেশের উচ্চশিক্ষার মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৭০ শতাংশ।
জাতীয়, উন্মুক্ত ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে বাকি ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা ১৬ হাজার ৮০৫ জন। এর মধ্যে অধ্যাপক ৫,৩৪১ জন, সহযোগী অধ্যাপক ৩,০৪৮ জন, সহকারী অধ্যাপক ৫,০৯৭ জন এবং প্রভাষক ২,২৮৮ জন। এছাড়া অন্যান্য পদে রয়েছেন ১,০৩১ জন শিক্ষক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই ২০২৩ সালে ৮৪টি বিভাগে ২,৪১৮ জন শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৯২৩ জন অধ্যাপক, ৪৫৯ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৫২৯ জন সহকারী অধ্যাপক, ৩৮২ জন প্রভাষক এবং ১২৫ জন অন্যান্য পদে কর্মরত।
সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে ৬,৪০৭ জন পিএইচডিধারী এবং ১,০৩২ জন এমফিলধারী শিক্ষক রয়েছেন। অর্থাৎ মোট ৪৪ দশমিক ২৭ শতাংশ শিক্ষক উচ্চতর ডিগ্রিধারী। বর্তমানে ২,৬৮৩ জন শিক্ষক বিদেশে বা দেশে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে শিক্ষাছুটিতে আছেন।
ইউজিসি জানায়, প্রতিবেদনটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সরবরাহকৃত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। এবার কোনো বিশেষ সুপারিশ রাখা হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের জন্য ন্যূনতম পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়ে আসছেন।
তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় মানেই একটি গবেষণাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান। তাই এর শিক্ষক হতে হলে সেই মানসিকতা ও যোগ্যতা থাকা জরুরি। ইউরোপ, ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানের মতো দেশগুলোতে এখন শিক্ষক নিয়োগে পিএইচডি তো বটেই, পোস্টডক্টরাল গবেষণাও বাধ্যতামূলক।”
তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন, “যেভাবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক পদে পিএইচডি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, ভবিষ্যতে প্রাথমিক পদেও এ নিয়ম চালু হবে।”