প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: শুক্রবার , ২৮ ফেব্রুয়ারি , ২০২৫
রাষ্ট্রের সর্বস্তর থেকে যাবতীয় বৈষম্য দূর করার দাবি তুলে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক চেহারায় গত জুলাইয়ে শুরু হওয়া একটি ছাত্র আন্দোলন মাত্র ৩৬ দিনের মাথায় আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শক্তিশালী শাসন ব্যবস্থা ভেঙে দিতে পেরেছিল।
তারপর গত সাত মাসে লম্বা দম নিয়ে; তৃণমূলে শক্তি সঞ্চার করেছেন জুলাই বিপ্লবের শীর্ষ নেতারা। দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে রাষ্ট্রের পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিনির্মাণের লক্ষ্যে সেই অরাজনৈতিক তরুণরা এবার নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।
শুক্রবার সন্ধ্যার পর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ পাশে মানিক মিয়া এভিনিউতে দেশের শীর্ষ রাজনীতিক, কূটনীতিক, জুলাই যোদ্ধা, জুলাইয়ের শহিদ পরিবারের সদস্যরাসহ লক্ষাধিক লোকের সমাগমে নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নাম ঘোষণা করা হয়।
একে একে ঘোষণা করা হয় আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেনসহ শীর্ষ ১১ নেতার নাম।
শুরুতে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্য সচিব আখতার হোসেনের নাম ঘোষণা করেন জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ইসমাইল হোসেন রাব্বীর বোন মীম আক্তার।
এরপর আংশিক আহ্বায়ক কমিটির পুরোটা ঘোষণা করেন সদস্য সচিব আখতার।
দলের শীর্ষ ১০
আহ্বায়ক: নাহিদ ইসলাম
সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক: সামান্তা শারমিন
সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক: আরিফুল ইসলাম আদীব
সদস্য সচিব: আখতার হোসেন
সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব: তাসনিম জারা
সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব: নাহিদা সারোয়ার নিভা
মুখ্য সংগঠক: হাসনাত আবদুল্লাহ (দক্ষিণাঞ্চল)
মুখ্য সংগঠক: সারজিস আলম (উত্তরাঞ্চল)
মুখ্য সমন্বয়ক: নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী
সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক: আব্দুল হান্নান মাসউদ।
এরপর ঘোষণা করা হয় ১৬ জন যুগ্ম আহ্বায়কের নাম। তারা হলেন- নুসরাত তাবাসসুম, মুনিরা শারমীন, মাহবুব আলম, সারোয়ার তুষার, অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন, তাসনুভা জাবিন, সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়া, আতিক মুজাহিদ, আশরাফ উদ্দিন, অর্পিতা সাহা দেব, তানজিল মাহমুদ, অনিক রায়, খালেদ সাইফুল্লাহ, জাবেদ রাসিন, এহতেশাম হক ও হাসান আলী।
যুগ্ম সদস্য সচিব পদে যাদের নাম অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে বলা হয়েছে, তারা হলেন- আব্দুল্লাহ আল আমিন, আরিফ সোহেল, রশিদুল ইসলাম রিফাত, মাহিন সরকার, মো. নিজাম উদ্দিন, আকরাম হুসাইন, এসএম সাইফ মুস্তাফিজ, সালেহ উদ্দিন সিফাত (দপ্তরে সংযুক্ত), আলাউদ্দিন মোহাম্মদ, ফরিদ উদ্দিন, মো. ফরহাদ আলম ভুঁইয়া, মোহাম্মদ মিরাজ মিয়া, লুৎফর রহমান, মো. মইনুল ইসলাম তুহিন, মুশফিকুস সালেহীন, ড. জাহিদুল ইসলাম, জহিরুল ইসলাম মুসা, হুমায়ুরা নূর, মুশফিকুর রহমান জোভান, মোল্লা মোহাম্মদ ফারুক এহসান, সাগুফতা বুশরা মিশমা, আহনাফ সাঈদ খান, আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দিন, মীর আরশাদুল হক, ফয়সাল মাহমুদ শান্ত, তারেক রেজা, মশিউর রহমান, জয়নাল আবেদীন শিশির, মুনতাসির রহমান, গাজী সালাহউদ্দিন তানভীর, তামিম আহমেদ ও তাহসিন রিয়াজ।
দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের জন্য ১২ যুগ্ম মুখ্য সংগঠকের নাম ঘোষণা করা হয়। দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠকরা হলেন- মো. আতাউল্লাহ, ডা. মাহমুদা মিতু, মোল্লা রহমতউল্লাহ, এসএম শাহরিয়ার ও জোবায়ের আরিফ।
আর উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠকরা হলেন- সাইফুল্লাহ হায়দার, আলী নাসের খান, সাকিব মাহাদী, অবসরপ্রাপ্ত মেজর আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, সাদিয়া ফারজানা দিনা, অলিক মৃ ও হানিফ খান সজীব।
এনসিপির আংশিক আহ্বায়ক কমিটির ১৪ জন যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়কারী রয়েছেন। তারা হলেন- তারিকুল ইসলাম (যুব উইং), ডা. আবদুল আহাদ, দিলশানা পারুল, আবু হানিফ, আবদুস জাহির, মাজহারুল ইসলাম ফকির, গোলাম মুর্তুজা সেলিম, আশেকীন আলম, ডা. জাহিদুল বারী, কৈলাশ চন্দ্র রবিদাস, ডিম্পালী ডেভিড রাজু, শাহ মঈনুদ্দিন, মারজুক আহমেদ ও সাদ্দাম হোসেন।
সেকেন্ড রিপাবলিকের ঘোষণাপত্র
দলের ঘোষণাপত্রে বলা হয়, কেবল একটি সরকারের পতন ঘটিয়ে আরেকটি সরকার বসানোর জন্য জুলাই অভ্যুত্থান হয়নি; বরং ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা’ বিলোপের মাধ্যমে ‘অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র পুনর্গঠিত’ করার জন্য নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষা থেকেই সাড়া দিয়েছিল জনগণ।
জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই শুক্রবার নিজেদের আত্মপ্রকাশের কথা তুলে ধরে নতুন রাজনৈতিক দলটি বলেছে, সেই লক্ষ্য পূরণে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠা এবং নতুন সংবিধানও রচনা করবে তারা।
জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে গঠিত এই নতুন দলের নেতৃত্ব দেবেন নাহিদ ইসলাম, যিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে নাম লেখানোর জন্য দুদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব ছেড়ে এসেছেন।
অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে দলের আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পর দলের ঘোষণাপত্র পড়ে শোনান আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দুশ বছরের লড়াই, ২৩ বছরের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম এবং সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করলেও জনগণ তাদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বন্দোবস্ত পায়নি।
“স্বাধীনতার পর দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশের জনগণকে বারবার গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে হয়েছে। ১৯৯০ সালে ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সামরিক স্বৈরাচারকে হটিয়েছে। তথাপি, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়েও আমরা গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে— এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে পারিনি।”
এর বিপরীতে বিগত ১৫ বছর দেশে একটি ‘নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল’ বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে বেপরোয়া ব্যবহার করে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা হয়েছে। বিরোধী মতের কণ্ঠরোধ, গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও অর্থ পাচারকে একটি রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করা হয়েছে।”
ঘোষণাপত্রে নাহিদ ইসলাম বলেন, “জুলাই ২০২৪-এ ছাত্র-জনতা বিপুল আত্মত্যাগের মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে, হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন স্বাধীনতা কেবল একটি সরকার পতন করে আরেকটি সরকার বসানোর জন্যই ঘটেনি।
“জনগণ বরং রাষ্ট্রের আষ্টেপৃষ্ঠে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষা থেকে এই অভ্যুত্থানে সাড়া দিয়েছিলো, যেন জনগণের অধিকারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠিত হয়।”
জনগণের আকাঙ্ক্ষার সেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় লক্ষ্যে এনসিপি প্রতিষ্ঠা করার কথা তুলে ধরে দলের আহ্বায়ক বলেন, “এটি হবে একটি গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল।”
জুলাই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ‘সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের সূচনা করেছে’ বলে মন্তব্য করেন নাহিদ। তিনি বলেন, “একটি গণতান্ত্রিক নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদেরকে সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সকল সম্ভাবনার অবসান ঘটাতে হবে।
“আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন আমাদের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষ্য।”
রিপাবলিক হচ্ছে সভ্য ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা যা একটি সংবিধান, আইন, বিধি ও অন্যান্য সুনির্দিষ্ট কাঠামো দিয়ে সাজানো থাকে। ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ ধারণাটি এসেছে ফ্রান্সের ইতিহাস থেকে। দফায় দফায় শাসন বদলে ফ্রান্সে এখন পঞ্চম রিপাবলিক চলছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ভেঙে পড়া রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় গড়ে তোলা ও তাদের গণতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষা করা হবে আমাদের রাজনীতির অগ্রাধিকার। এর মধ্য দিয়েই কেবল আমরা একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারব।”
ঘোষণাপত্রে এনসিপি বলছে, তারা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ চায়, যেখানে সমাজে ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ‘বিভেদের বদলে ঐক্য, প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচার এবং পরিবারতন্ত্রের বদলে মেধা ও যোগ্যতার’ মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হবে। যেখানে রাজনীতিতে ‘দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির’ কোনো স্থান হবে না।
“আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে মূলধারায় তুলে আনা হবে। আমাদের রিপাবলিকে সাধারণ মানুষ, একমাত্র সাধারণ মানুষই হবে ক্ষমতার সর্বময় উৎস। তাদের সকল ধরনের গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকারের শক্তিশালী সুরক্ষাই হবে আমাদের রাজনীতির মূলমন্ত্র।”
বিদ্যমান জাতিগত, সামাজিক, লিঙ্গীয়, ধর্মীয় আর সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও বৈচিত্র্য রক্ষার মাধ্যমে একটি ‘বহুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণে’ করার লক্ষ্য নেওয়ার কথা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমাদের রিপাবলিক সকল নাগরিককে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে শক্তিশালী সুরক্ষা প্রদান করবে। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর কোনো অংশকেই অপরায়ন করা হবে না। বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে সমান গুরুত্ব প্রদান ও সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।”
আর্থিক খাতে কেমন ব্যবস্থাপনা এনসিপি আনতে চায়, সে বিষয়ে ধারণা দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “অর্থনীতিতে, আমরা কৃষি-সেবা-উৎপাদন খাতের যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন একটি জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই যেটি হবে স্বনির্ভর, আয়-বৈষম্যহীন ও প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল। আমাদের অর্থনীতিতে সম্পদ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত হবে না, বরং সম্পদের সুষম পুনর্বণ্টন হবে আমাদের অর্থনীতির মূলমন্ত্র।
“আমরা বেসরকারি খাতের সিন্ডিকেট ও গোষ্ঠীস্বার্থ নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ভোক্তা ও জনস্বার্থ সংরক্ষণ করবো। অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাধ্যমে এই অঞ্চলের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাড়াতে আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করব এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতে জোর দিয়ে উদ্ভাবনী সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি টেকসই, আধুনিক অর্থনীতি গড়ে তুলব।”
‘ন্যায্যতা ও সমতাভিত্তিক’ সমাজ প্রতিষ্ঠায় সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধেই বিজয় নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও শপথ।
“চলুন আমরা একসঙ্গে, হাতে হাত রেখে, এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলি যেখানে প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হবে, যেখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকারের সংগ্রামই হবে রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য। যেখানে সাম্য ও মানবিক মর্যাদা হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি। এখনই সময়— নতুন স্বপ্ন দেখার, নতুন পথচলার, এবং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার!”
এনসিপি বলছে, “এই নতুন বাংলাদেশ গড়ায় আমরা সবাই প্রত্যেকে যার-যার অবস্থান থেকে শপথ করি। ঐক্যবদ্ধ হই। এবং আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে যাই। আমাদের দেশ, আমাদের অধিকার, আমাদের ভবিষ্যৎ— আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক অধরা কোন স্বপ্ন নয়, এটি আমাদের প্রতিজ্ঞা!”
যেভাবে আত্মপ্রকাশ
শুক্রবার বিকাল সোয়া ৪টার দিকে ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউয়ে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে এ অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর একে একে পাঠ করা হয় গীতা, ত্রিপিটক ও বাইবেল থেকে। এরপর পরিবেশন করা হয় জাতীয় সংগীত।
এর মধ্যে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের এক পাশে সমাবেশস্থল ও আশপাশের এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। সমাবেশের নির্ধারিত অংশের বাইরে দক্ষিণ প্লাজার সামনের অংশে খামারবাড়ি পর্যন্ত প্রায় পুরো সড়কেই অবস্থান রয়েছে মানুষের।
জাতীয় সংগীতের পর চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং প্রত্যেকের ধর্ম অনুযায়ী প্রার্থনা করা হয়।
বক্তৃতা পর্বের শুরুতে জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল্লাহ হায়দার বলেন, “এই তরুণদের নেতৃত্বে আগামীর বাংলাদেশ গত ৫৩ বছরে মানুষের যে অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় নাই, সে অধিকার প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম প্রতিষ্ঠা করা হবে।”
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহিন সরকার বলেন, “নাগরিক পার্টি মনে করে, শহীদ ও আহতদের স্পিরিট ধারণ করে কীভাবে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা এক থাকব।”
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পক্ষে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহরিয়ার হাসনাত অপু বক্তব্য দেন।
এরপর মঞ্চের ডাকা হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নায়কদের। একে একে মঞ্চে আসেন নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনসহ নেতারা। তারপর দেখানো হয় জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর নির্মিত আরেকটি ডকুমেন্টারি।
এরপর শুরু হয় বক্তৃপর্ব। নতুন দলের নেতারা একে এক বক্তব্য দেন। মাঝে আরেকটা তথ্যচিত্র দেখানো হয়। এরপর আরেক দফা বক্তৃতা পর্ব শেষে দলের নাম এবং আহ্বায়কের নাম ঘোষণা করেন জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ইসমাইল হোসেন রাব্বীর বোন মীম আক্তার।
এরপর বক্তৃতা দিতে এসে এসসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন দলের ১৫১ সদস্যের আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে। তার বক্তব্য শেষে মঞ্চে আহ্বান জানানো হয় নাহিদ ইসলামকে। ঘোষক তাকে বর্ণনা করেন ‘জুলাই অভ্যুত্থানের ইমাম’ হিসেবে।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা মনে করি, বাংলাদেশে যে বিভাজনের রাজনীতি তৈরি করে বাংলাদেশের জনগণকে দুর্বল করে রেখে, রাষ্ট্রকে দুর্বল করে রাখার যে ষড়যন্ত্র তৈরি হয়েছিল, সেই ষড়যন্ত্র আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সকলের ঐক্যের মাধ্যমে ভেঙে দিয়েছি।
“আমরা আজকের এই মঞ্চ থেকে শপথ করতে চাই, বাংলাদেশকে আর কখনও বিভাজিত করা যাবে না। বাংলাদেশে ভারতপন্থি-পাকিস্তানপন্থি কোনো রাজনীতির ঠাঁই হবে না। আমরা বাংলাদেশকে সামনে রেখে, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনীতি এবং রাষ্ট্র বিনির্মাণ করব।”
দলের ঘোষণাপত্র পাঠ করার মধ্য দিয়ে শেষ হয় আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান।