বিশেষ প্রতিনিধি, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার , ২৭ ফেব্রুয়ারি , ২০২৫
ছবি: সংগৃহিত
অনেক সময় শিষ্য যে নিজ যোগ্যতায় গুরুকেও ছাড়িয়ে যান, বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবের মুখ নাহিদ ইসলাম কি তার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠলেন?
নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ বা এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ যখন সদস্য সচিব হিসাবে আখতার হোসেন পাচ্ছেন, তখন অন্তত সে রকমটা ভাবা-ই যায়।
গণঅভ্যুত্থানের নেতারা কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করলে শেখ হাসিনার পালানোর পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম যে তার হাল ধরবেন, সেটি প্রায় অবধারিতই ছিল।
তবে, অনেক জল্পনা-কল্পনার পর নতুন দলে নাহিদ যাকে সেকেন্ডে-ইন-কমান্ড হিসাবে পেলেন, সেই আখতার হোসেনের প্রতিষ্ঠিত ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’তে একই অবস্থানে ছিলেন জুলাই অভ্যুত্থানের এই মুখপাত্র।
এবার ‘শিষ্য’ নাহিদ ইসলাম এনসিপি-তে আহ্বায়ক হওয়ার মধ্য দিয়ে ছাপিয়ে গেলেন তারই রাজনৈতিক ‘গুরু’ আখতার হোসেনকে।
কোটা সংস্কার থেকে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের নেতাদের উদ্যোগে গঠিত এনসিপি আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে শুক্রবার; জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের মানিক মিয়া এভিনিউতে।
নাহিদ ইসলাম বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষমতা বলয়ে আসেন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে গত জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতার ৩৬ দিনের অভাবনীয় আন্দোলনে সমন্বয়ক ও মুখপাত্র হিসাবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে।
ব্যাপক রক্তপাত আর বলপ্রয়োগের পর ৫ অগাস্ট দেড় দশকের স্বৈরশাসনের ইতি টানেন শেখ হাসিনা; তার বাসভবনমুখী জনতার স্রোতের মধ্যে সামরিক বিমানে ভারতে পালিয়ে যান তিনি।
এরপর ৮ অগাস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, তাতে জায়গা করে নেন নাহিদ ইসলাম। মাত্র ২৬ বছর বয়সি এই তরুণ তুর্কী দায়িত্ব পান তথ্য ও সম্প্রচার এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের।
এর মধ্যে ইউনূস সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ নামে জুলাই বিপ্লবীদের আরেকটি প্ল্যাটফর্মের যাত্রা শুরু হয়।
সারা দেশে জেলায় ও উপজেলায় উভয় প্ল্যাটফর্মের কমিটি গঠন আর জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল, মূলধারায় রাজনীতিতে নাম লেখাতে যাচ্ছেন জুলাই বিপ্লবীরা।
নতুন রাজনৈতিক দলে গণহত্যার অভিযোগের মুখে থাকা শেখ হাসিনার পতনের এক দফার ঘোষণাকারী নাহিদই যে প্রধান হচ্ছেন, তা অনুমেয়ই ছিল। সে কারণে নাগরিক কমিটির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় অনেকটা বিতর্কের বাইরে ছিল তার আহ্বায়ক পদটি।
গুরু-শিষ্যের যাত্রাপথ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাহিদ ২০২৩ সালে ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’র সদস্য সচিব ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৫-১৬ সেশনের শিক্ষার্থী আখতার হোসেন ২০১৮ সালের অক্টোবরে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত 'ঘ' ইউনিটের প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে অনশন করার মধ্য দিয়ে।
এর মধ্যে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০১৮ সালের আন্দোলনেও অংশগ্রহণ ছিল তার। সেই সময় আন্দোলন চলে ‘সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ ব্যানারে।
ওই আন্দোলনে কোটা সংস্কারের দাবি তোলা হলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেকটা জেদের বশে কোটা ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছিলেন।
পরে ২০১৯ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে এ ব্যানারের প্যানেল থেকে প্রার্থী হয়ে ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন নুরুল হক নুর। তার সঙ্গী আখতার হোসেন হয়েছিলেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ করা হয়।
পরে নুরুল হক নূর গণঅধিকার পরিষদ নামে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। ছাত্র অধিকারের কেন্দ্রীয় নেতারা নুরের নেতৃত্বাধীন গণ অধিকার পরিষদে গিয়ে দলীয় লেজুড়বৃত্তি করছে অভিযোগ এনে ২০২৩ সালের ২৩ জুলাই একযোগে পদত্যাগের ঘোষণা দেন সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরা।
ছবি: আখতার হোসেনকে আহ্বায়ক করে ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’ আত্মপ্রকাশ করে। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্য পাঠ করছেন নাহিদ ইসলাম
পরে ৪ অক্টোবর তারা ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’ নামে স্বতন্ত্র ছাত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশ করেন। প্রাথমিকভাবে গঠিত ২১ সদস্যের কমিটিতে আখতার হোসেন নিজেই আহ্বায়ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলামকে সদস্য সচিব করা হয়।
এছাড়া ছাত্র অধিকার পরিষদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক এবং মো. আবু বাকের মজুমদারকে সদস্য সচিব করে ছাত্রশক্তির ৩৩ সদস্যের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল।
২০১৮ সালে শেখ হাসিনার বাতিল করে দেওয়া কোটা ব্যবস্থা গত বছরের জুনে আদালতের রায়ে পুনরায় ফিরে আসলে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলনের সামনের সারিতে চলে আসেন গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির নেতারা।
জুনে ছোটোখাটো কর্মসূচির পর জুলাইয়ে বড় কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ব্যানারে; মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করতে থাকেন নাহিদ আর আসিফ মাহমুদরা।
শুরুতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ইউনূস উপদেষ্টা পরিষদে নাহিদের সঙ্গে জায়গা হয় আসিফ মাহমুদেরও; যিনি আখতারের সংগঠন ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক ছিলেন। এরপর জুলাই আন্দোলনের তৃতীয় ছাত্রনেতা হিসাবে মাহফুজ আলমও যোগ দেন উপদেষ্টা পরিষদে।
ক্ষমতার চেয়ার ছেড়ে মাঠে রাজনীতিতে
নতুন রাজনৈতিক দলের আহ্বায়ক হিসাবে দায়িত্বগ্রহণের বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পর উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছেন নাহিদ ইসলাম। তার এই পদত্যাগকে নজিরবিহীন হিসাবে অভিহিত করেছেন অনেকে।
অধ্যাপক ইউনূস বরাবর ২৫ ফেব্রুয়ারি লেখা পদত্যাগপত্রে নাহিদ লিখেছেন, বর্তমান পটভূমিতে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ছাত্র-জনতার কাতারে উপস্থিত থাকা উচিত বলে মনে করছেন তিনি।
পরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সরকারের বাইরে থেকে মাঠে আমার ভূমিকা বেশি কার্যকর হবে বলে মনে করেছি।"
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, "ছয় মাসে দুটি মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করেছি। সময় কম থাকলেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আমার কাজের মূল্যায়ন জনগণ করবে।"
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এক ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ক্ষুরধার রাজনৈতিক মন নাহিদ ইসলাম। তার বয়স মাত্র ২৬ এবং ইতিমধ্যে একজন নৃশংস স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে একটি জনপ্রিয় বিদ্রোহ নেতৃত্ব দিয়েছেন।
“তিনি দেশের রাজনীতিতে আরো কয়েক দশক বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকবেন। আর আল্লাহ জানে, একদিন তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীও হতে পারেন।”
দুর্নীতির অভিযোগ, নাহিদের জবাব
পালাবদলের এই ক্রান্তিকালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলানোর ক্ষেত্রে নাহিদ ইসলাম ‘ক্লিন ইমেজ’ ধরে রাখতে পেরেছেন বলে মত অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের।
এর মধ্যে তার স্কুলশিক্ষক বাবা এবং তাকে নিয়ে দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; যেসব প্রচারণায় অগ্রভাগে ছিল আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ বিষয় একটি ভুয়া ওয়েবসাইটের খবর ফেইসবুকে প্রকাশ করে পরে মুছে দিয়েছেন হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়।
এসব অভিযোগের পাল্টায় এক ফেইসবুক পোস্টে নাহিদ ইসলাম উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দেওয়ার পর তার আয়-ব্যয়ের একটা হিসাব প্রকাশ করেছেন। এভাবে হিসাব প্রকাশ করে স্বচ্ছতা দেখানোয় অনেকে তার প্রশংসা করছেন।
তিনি লিখেছেন, উপদেষ্টা হওয়ার আগে তার কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না। ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট উপদেষ্টা পদে দায়িত্ব পালনের জন্য সম্মানী গ্রহণের লক্ষ্যে সরকারিভাবে যে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়, তাতে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জমা হয়েছে ১০ লাখ ৬ হাজার ৮৮৬ টাকা। বাইরে তার কোনো
নাহিদ লেখেন, “উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন, আমার বা আমার পরিবারের কোনো সদস্যের (স্ত্রী/মা/বাবা) নামে বাংলাদেশের কোথাও জমি বা ফ্ল্যাট নেই বা আমার বা আমার পরিবার কর্তৃক ক্রয় করা হয়নি।
“আমার একান্ত সচিবের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এর হিসাবে ৩৬,০২৮ (ছত্রিশ হাজার আটাশ) টাকা রয়েছে। উনি একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর উনার নিজের নামে বা উনার পরিবারের (স্ত্রী/মা/বাবা) কারো নামে বাংলাদেশের কোথাও কোনো সম্পত্তি ক্রয় করা হয়নি।
“এছাড়া আমার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট যে কারো সম্পদের স্বচ্ছ হিসাব রয়েছে। প্রয়োজনে উন্মুক্ত করা হবে। তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ অনুযায়ী বাংলাদেশের যেকোনো সরকারি দপ্তরে উক্ত তথ্য যাচাইযোগ্য।”