প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: শনিবার , ১২ জুলাই , ২০২৫
রাজধানীর বাবুবাজার সংলগ্ন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) সামনে বসায়ীকে প্রকাশ্যে পাথর মেরে ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসা ক্যাম্পাস।
ঘটনার পর শুক্রবার (১১ জুলাই) রাতে এসব ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার দাবি জানান তারা। ‘ক্যাম্পাস মিরর’-এর প্রতিনিধিদের পাঠানো :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যায় বিভিন্ন হল এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে ভিসি চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘অ্যাকশন অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘যুবদলের সন্ত্রাস, রুখে দেবে ছাত্রসমাজ’, ‘মিটফোর্ড খুন কেন? তারেক রহমান জবাব দে’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
ঢাবি শিক্ষার্থী এবি জুবায়ের বলেন, “সোহাগ হত্যার ভিডিও দেখে আমরা শিউরে উঠেছি। চাঁদা না দেওয়ার কারণে তাকে পাথর দিয়ে হত্যা করেছে যুবদলের সন্ত্রাসীরা। এটা কি নতুন করে প্রস্তর যুগে ফিরে যাওয়া নয়?”
বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, “যারা মজলুম ছিল তারা এখন জালিমে পরিণত হয়েছে। বিএনপি একশ'র বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। প্রতিটি ঘটনার বিচার চাই।”
অপরদিকে রাত ১০টায় ঢাকা বিক্ষোভ মিছিল করেছে শাখা ছাত্রদল। মিছিলটি টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ থেকে শুরু করে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে রোকেয়া হলের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
ঢাবি শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আনিসুর রহমান বলেন, “মিটফোর্ডের সামনে ব্যবসায়ী সোহাগকে যেভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, এটি দেখে আমরা মর্মাহত, লজ্জিত এবং শঙ্কিত।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি)শহীদ শামসুজ্জোহা চত্বরে রাতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। স্লোগান ওঠে : ‘রক্তে ভেজা আমার ভাই, খুনি তোমার রেহাই নাই’, ‘চাঁদাবাজের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না।’
কর্মসূচিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মেহেদী সজীব বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের দায় শুধু যুবদলের নয়—এটি সামগ্রিকভাবে বিএনপির রাজনৈতিক চরিত্রকে নগ্ন করে দিয়েছে।”
রাবি ছাত্র ফজলে রাব্বি মো. ফাহিম বলেন, “তারেক রহমানকে দেশে ফিরে আসতে হবে। বিদেশ থেকে খুনের খেলা আর চলতে দেওয়া হবে না।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) জিরো পয়েন্টে রাত ৯টার দিকে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন। তারা বলেন, “জুলাই-আগস্টের রক্তের বিনিময়ে গড়া নতুন বাংলাদেশে চাঁদাবাজদের জায়গা হবে না।”
চবি ছাত্রআমিনুল ইসলাম রাকিব বলেন, “যারা আবারও আধিপত্য কায়েম করতে চায়, তাদের জানিয়ে দিচ্ছি—এই বাংলাদেশে আর কোনো চাঁদাবাজ, স্বৈরাচার টিকবে না।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) শুক্রবার রাত ১০টায় বটতলা এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি শহীদ রফিক-জব্বার হল হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহণ চত্বর দিয়ে কয়েকটি সড়ক ঘুরে আবার বটতলায় এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয় ।
শিক্ষার্থীরা—‘যুবদল খুন করে, ইন্টেরিম কি করে’, ‘যুবদল খুন করে, তারেখ কি করে’, ‘বিএনপির অনেক গুণ, নয় মাসে দেড়শো খুন’, ‘যেই হাত খুন করে, সেই হাত ভেঙে দাও’, ‘যুবদলের অনেক গুন, পাথর মেরে মানুষ খুন’, ‘চাঁদা তোলে পল্টনে, চলে যায় লন্ডনে’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
সমাবেশে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ জাবি শাখার সিনিয়র যুগ্মসচিব আহসান লাবিবের পরিচালনায় বক্তারা বক্তব্য রাখেন। উপস্থিত ছিলেন বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহসান ইমাম।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে সালাম হল বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়। পরে মালেক হল, খাদিজা হল, জুলাই স্মৃতি হল প্রদক্ষিণ করে শহীদ মিনারে এসে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে মিছিলটি শেষ হয়।
এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘আবু সাইদ মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ’, ‘যুবদলের চাঁদাবাজরা, হুঁশিয়ার সাবধান’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা রাত ১১টায় প্রধান ফটক থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। তাদের বিক্ষোভের কারণে প্রায় ৪৫ মিনিট ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরুদ্ধ থাকে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ‘চাঁদাবাজদের ঠিকানা এই বাংলায় হবেনা ’, ‘বিএনপির অনেক গুন নয় মাসে দেড় শত খুন’, ‘যুবদলের ঠিকানা এই বাংলায় হবে না’—ইত্যাদি স্লোগান দেন।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত সাড়ে ৯টায় শাহপরান হল থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। সমাবেশে শিক্ষার্থী বলেন, “এদেশে আর কোনো চাঁদাবাজ এবং সন্ত্রাসী দলকে আমরা আর ক্ষমতায় দেখতে চাই না।”
মিছিলে শিক্ষার্থীরা ‘ওয়ান টু থ্রি ফোর, চাঁদাবাজ নো মোর’, ‘চাঁদাবাজের কালো হাত, ভেঙে দাও গুড়িয়ে দাও’, ‘চাঁদাবাজের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’, ‘যুবদলের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত সাড়ে ৯ টায় ‘জুলাই বিপ্লব মঞ্চ’র উদ্যোগে প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থান এর মধ্য দিয়ে আমাদের স্বপ্ন ছিল আমরা অন্যায়, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দমন-নিপীড়ন ও অপরাজনীতি মুক্ত এক নতুন বাংলাদেশ গড়ব।”
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত ১০ টায় শেরে বাংলা হল থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি বিজয় ২৪ হল হয়ে পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে গ্রাউন্ড ফ্লোরে গিয়ে শেষ হয়। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত সাড়ে ৮টায় প্রধান ফটকে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। এসময় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন স্লোগান দিতে শোনা যায়, ‘মিটফোর্ডে খুন কেন? তারেক রহমান জবাব দে’, ‘ভোলায় ধর্ষণ কেন? তারেক রহমান জবাব দে’, ‘যুবদলের অনেক গুণ, পাথর মেরে মানুষ খুন’ সহ নানা প্রতিবাদী স্লোগান দেন।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত সাড়ে আটটায় প্রধান ফটক থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে বিক্ষোভ মিছিলটি শেষ হয়।
এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘টু জিরো টু ফোর , চাঁদাবাজি নো মোর’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেনো বাহিরে’ বলে স্লোগান দেন।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জিয়ামোড় থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ডায়না চত্বরে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়।
মিছিলে শিক্ষার্থীরা ‘ওয়ান টু থ্রি ফোর, চাঁদাবাজ নো মোর’, ‘বিএনপি যুবদল, তুই খুনি তুই খুনি’, ‘চব্বিশের বাংলায়, চাঁদাবাজের ঠাঁই নাই’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত সাড়ে ১০টায় বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। এসময় শিক্ষার্থীরা ‘আমার ভাই কবরে, ইন্টেরিয়ম কী করে’, ‘অ্যাকশন টু অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ সহ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীরা রাত ১১টায় টিএসসিতে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। সমাবেশে লিখিত বক্তব্যে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আবদুন নূর তুষার।
তিনি বলেন, “এক ব্যবসায়ীকে পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে, উলঙ্গ করে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত ও উদ্বিগ্ন। একজন মানুষকে এমন পাশবিকভাবে হত্যা করার মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজের চরম মানবিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র ফুঁটে উঠেছে।”বিজ্ঞাপন
দাবিগুলো হলো :
১. সোহাগ হত্যার ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
২. অভিযুক্ত মাহিন এবং রবিনসহ সব অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
৩. সমগ্র বাংলাদেশে চাঁদাবাজি ও নিয়োগ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
৪. রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার করে অপরাধীদের রক্ষার সংস্কৃতি বন্ধ করা।
৫. ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীরা রাত সাড়ে ৯টায় হল পাড়া থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এরপর সাইন্সল্যাব থেকে নীলক্ষেত মোড় হয়ে ঢাকা কলেজের মূল ফটকের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। এসময় শিক্ষার্থীরা বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রীরা রাত সাড়ে ১২টায় আবাসিক হল থেকে বের হয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। এসময় হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার দাবি জানান তারা।
ছাত্রীরা এ সময়- ‘সন্ত্রাসীদের কালো হাত, ভেঙে দাও গুড়ি দাও’, ‘যুবদলের কালো হাত, ভেঙে দাও, গুড়িয়ে দাও’, ‘সন্ত্রাসীদের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাত ১০টা থেকে ক্যাম্পাসের সেকেন্ড গেট থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, আবাসিক ভবন, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে আগারগাঁও মোড় প্রদক্ষিণ শেষে আগারগাঁও-ফার্মগেট রড দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকেন্ড গেটে এসে শেষ হয়।
মাওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে মান্নান হলের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
এ সময় তারা ‘পাথর মেরে করে খুন, যুবদলের অনেক গুন’, ‘আমার সোনার বাংলায় খুনিদের ঠাঁই নাই, চাঁদাবাজের ঠিকানা এই বাংলা হবে না’-এ ধরনের বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
প্রসঙ্গত, মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ব্যস্ত সড়কে বুধবার (১০ জুলাই) প্রকাশ্যে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ সময় ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে পিটিয়ে ও ইট-পাথর দিয়ে আঘাত করে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে বিবস্ত্র করে আবারও তাকে পাথর মারা হয়।