প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার , ২০ নভেম্বর , ২০২৫
বাংলাদেশের সংবিধানে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া ২০১১ সালের বিতর্কিত রায়কে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ আদালত নতুন ইতিহাস রচনা করেছে।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ সর্বসম্মত রায়ে জানায়— তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হলো, তবে তা ভবিষ্যৎ প্রয়োগযোগ্যতার ভিত্তিতে, অর্থাৎ চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই কার্যকর হবে।
এতে করে সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ফিরে এলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে।
বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) ঘোষিত রায়ে সর্বোচ্চ আদালত বলেন, ২০১১ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের যে রায় দেওয়া হয়েছিল, তা “একাধিক ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ” এবং “আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়”। ফলে রায়টি “ইন ইটস এনটায়ারিটি” বাতিল করা হলো।
রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের চতুর্থ ভাগের পরিচ্ছদ ২(ক)-এর অধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, যা ত্রয়োদশ সংশোধনীর ৩ ধারায় প্রবর্তিত হয়েছিল, পুনরায় সক্রিয় করা হয়েছে।
তবে আদালত স্পষ্ট করে দেন, ৫৮(গ) ধারা অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে, কিন্তু যেহেতু বর্তমান সংসদ অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে, তাই তাৎক্ষণিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কোনো সাংবিধানিক সুযোগ নেই। এই কারণেই সংশোধনী পুনরুজ্জীবিত হলেও এখনই তা কার্যকর হচ্ছে না।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের পাশাপাশি বেঞ্চে ছিলেন—বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
রায় ঘোষণার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, “আজ যেন ঈদের দিন। শুধু বিএনপি নয়, গোটা জাতি খুশি।” তিনি জানান, ত্রয়োদশ সংশোধনীতে বর্ণিত ৫৮(১) ও ৫৮(২) ধারা পুনরায় কার্যকর হওয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে এসেছে।
বিএনপির আরেক আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, রায়ের কার্যকারিতা প্রস্পেকটিভ, অর্থাৎ ভবিষ্যতের জন্য প্রযোজ্য। তাই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
জামায়াতে ইসলামী নেতাদের পক্ষের আইনজীবী শিশির মনির রায়কে “টেইন্টেড রায় বাতিলের সঠিক বিচার” বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা “রিভাইভড অ্যান্ড রেস্টোর্ড”, তবে ভবিষ্যৎ থেকে কার্যকর হবে।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পূর্ববর্তী রায়ে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়েছিল, সেটি সর্বসম্মতিক্রমে বাতিল করা হয়েছে। রায় ‘প্রস্পেক্টিভ ইফেক্ট’ পাওয়ায় পরবর্তী সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান কার্যকর হবে।
আগের রায়দাতাদের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১১ সালের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রস্তুতকালে বিচারপতি খায়রুল হকসহ কয়েকজন “আইনের লঙ্ঘন করেছেন” এবং মুখে ঘোষিত রায়ের সঙ্গে লিখিত রায়ের অমিল ছিল, যা দণ্ডবিধি ২১৯ ধারার আওতাধীন হতে পারে।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়কে ঘিরে জটিল আইনগত পরিস্থিতি চলছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বদিউল আলম মজুমদার, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতের মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ মোট চারজন রিভিউ আবেদনকারী আদালতের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে আপিল বিভাগ পুনরায় আপিল শুনানির সিদ্ধান্ত নেয়। টানা ১০ দিনের শুনানি শেষে ২০ নভেম্বর রায়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয় এবং বৃহস্পতিবার তা ঘোষণা করা হয়।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা নতুন নয়। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। তখন সংবিধানেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল না, কিন্তু রাজনৈতিক ঐকমত্যে এ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। ওই সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
পরবর্তী বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ, জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়ার আন্দোলনে নামে। চাপের মুখে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকার ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে। এর অধীনে ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়।
তবে ২০০৬ সালে প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট সংকটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং পরে সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে দুই বছরের শাসন এ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট করে তোলে।
২০১১ সালে খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে, যার ওপর ভিত্তি করে সংসদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলোপ করে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে।
আইনজীবী শিশির মনির মনে করিয়ে দেন, পঞ্চদশ সংশোধনী-এর বিরুদ্ধেও আপিল বিভাগে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এতে শুধু তত্ত্বাবধায়ক নয়, আরও ২৯টি সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত। ফলে আজকের রায় চূড়ান্তভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেনি। ওই মামলার রায় এ বিতর্কের আরও সমাপ্তি ঘটাবে।
জুলাই সনদে যে সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব গণভোটে পাঠানো হয়েছে, তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চারটি বিকল্প কাঠামো রয়েছে। শিশির মনিরের মতে, গণভোটে তা অনুমোদিত হলে ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার ফরম্যাট আমূল পরিবর্তন হতে পারে।
বর্তমান কাঠামোতে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টা হবেন। তবে ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক পরিবর্তন এ ব্যবস্থাকে নতুন পথে নিতে পারে।