প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: বুধবার , ৬ আগস্ট , ২০২৫
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) রাতে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’-এর বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এই ঘোষণা দেন। নির্বাচনের সময়সূচি স্পষ্ট হওয়ায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও জল্পনার অবসান ঘটে।
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “রমজানের আগেই নির্বাচন হবে। আমি নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেব, যেন প্রস্তুতি গ্রহণ করে।” তিনি জানান, এবার প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হবে এবং নির্বাচনকে উৎসবমুখর করতে প্রযুক্তির সহায়তায় একটি অ্যাপ চালু করা হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ মতামত, অভিযোগ ও পরামর্শ জানাতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই, এই নির্বাচন হোক ইতিহাসের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও সৌহার্দপূর্ণ। যেন ভোটের দিনটি শিশুদের হাত ধরে কেন্দ্রমুখী হওয়ার দিন হয়, একটিমাত্র গণতান্ত্রিক আনন্দময় উৎসব হয়।” তার ভাষায়, “১৫ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এবার বকেয়া আনন্দসহ মহা-আনন্দে ভোট দিতে চাই।”
এবারের নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবং নারী ভোটারদের উৎসাহিত করতে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। একইসঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঐতিহাসিক অবদান স্মরণ করে বলেন, “রেমিট্যান্স যোদ্ধারা দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছেন। এবার তাদের ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে চাই।”
ভাষণে তিনি বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের জনগণ যে পরিবর্তনের জন্য রাস্তায় নেমেছিল, সেই চাহিদার প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—এই তিনটি দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি।” তিনি জানান, বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা ও জনপ্রশাসনে গতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে বহু পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করেছে।
তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত দেশের যত বড় রাজনৈতিক সংঘাতের পেছনে ছিল ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন। এবার যেন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।” নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘জুলাই সনদ’ শিগগিরই চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান তিনি। এই সনদে ভবিষ্যতে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো এবং ফ্যাসিবাদ রুখতে সাংবিধানিক গার্ডরেল নিশ্চিত করা হবে।
ড. ইউনূস বলেন, “জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আওতায় ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল ও জোট অংশ নিয়েছে। দুই ধাপে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে ১৯টি মৌলিক সংস্কার বিষয়ে অধিকাংশ দলের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদিও কিছু নোট অব ডিসেন্ট আছে, আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছেছি।”
ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন আবারও ফ্যাসিস্ট না হয়ে ওঠে, সে বিষয়ে সতর্কতা জানিয়ে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় কাঠামো এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যেন আবার কখনো গণ-অভ্যুত্থানের প্রয়োজন না পড়ে।”
ভাষণে বিচার কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা করেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, “জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচারকাজ দৃঢ় গতিতে এগিয়ে চলছে। শুনানির আনুষ্ঠানিক পর্ব শুরু হয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়া দেশবাসীর কাছে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ রাখা হবে।”
অর্থনীতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, “বাংলাদেশের সমুদ্রভাগ আমাদের নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত। আমরা পানিভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলতে চাই।” বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক শিল্প, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “উপকূলীয় অঞ্চলকে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে।”
ভাষণে তিনি বলেন, “এখন সময় এসেছে চিন্তায় মৌলিক পরিবর্তন আনার। সমুদ্রসম্পদ, গ্যাস ও জলজ উৎস কাজে লাগিয়ে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।”
উল্লেখ্য, গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন ড. ইউনূস। এরপর থেকে তিনি নির্বাচন আয়োজনের জন্য রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করে আসছেন। সর্বশেষ ২৬ জুলাই ১৪টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনায় নির্বাচনের সময় ঘোষণা দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে এবার দেশের ভোটাররা প্রথমবারের মতো নির্বাচনের দিনকে এক মহাউৎসবে পরিণত করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।