প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: মঙ্গলবার , ৫ আগস্ট , ২০২৫
মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে কোনো সরকারপ্রধান সরাসরি পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েননি—তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া ‘জুলাই বিপ্লব’ সেই নজিরই সৃষ্টি করে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন একপর্যায়ে রূপ নেয় সর্বাত্মক ছাত্র-জনতার বিদ্রোহে। এর মুখে ক্ষমতা হারায় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে দেশত্যাগ করলে, বিক্ষুব্ধ জনতার ঢেউ আছড়ে পড়ে গণভবনসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে। আজ সেই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি।
এই অভ্যুত্থানে প্রাণ হারিয়েছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ। রক্তাক্ত হয়েছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। ঘরে-বাইরে কেউ নিরাপদ ছিলেন না। গুলিতে পঙ্গু, অন্ধ ও স্থায়ীভাবে আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার। স্বাধীনতার পর আর কোনো আন্দোলনে এত প্রাণহানি ঘটেনি। ইতোমধ্যে ৮৪৪ শহীদের নাম ও ১১ হাজার ৫৫১ জন আহতের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
আন্দোলনের সূচনা
৫ জুন হাইকোর্ট সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল করে একটি রায় দেয়। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় প্রতিবাদ। শিক্ষার্থীরা কোটা নয়, মেধাভিত্তিক নিয়োগ বহাল রাখার দাবি জানান। দিন দিন এই দাবি ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশালসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষার্থীরা সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেন, তা পূরণ না হওয়ায় ১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে শুরু হয় ধারাবাহিক কর্মসূচি।
৪ জুলাই শাহবাগ মোড়ে পাঁচ ঘণ্টার অবরোধ এবং পরদিন দেশজুড়ে “বাংলা ব্লকেড” ডাকে সাড়া দিয়ে পুরো দেশের যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। ৮ জুলাই গঠিত হয় ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে ৬৫ সদস্যের সমন্বয়ক দল। ১০ জুলাই আপিল বিভাগ চার সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু পরিস্থিতি শান্ত না হয়ে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রী ও ছাত্রদের সংঘাত
১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “কোটা বিষয়ে আমার কিছুই করার নেই।” পাশাপাশি তিনি প্রশ্ন তোলেন, “মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরা না পেলে কি রাজাকারেরা পাবে?” তার এই মন্তব্য আন্দোলনকারীদের তীব্র ক্ষুব্ধ করে তোলে। রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে বিক্ষোভের কেন্দ্র। ‘আমি কে-তুমি কে, রাজাকার রাজাকার’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’সহ নানা স্লোগান ধ্বনিত হয়।
১৫ জুলাই ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারপন্থী’ বলে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে রক্তাক্ত হয় ক্যাম্পাস। পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগের গুলিবর্ষণের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে।
ছাত্র শহীদের মৃত্যু ও দেশজুড়ে বিক্ষোভ
১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুই যেন আন্দোলনে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তার বুকে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ছবি সারাদেশে ভাইরাল হয়। ১৭ জুলাই থেকে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, প্রথমে মোবাইল, পরে ব্রডব্যান্ডও। মেটা প্ল্যাটফর্মগুলো (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ) বন্ধ রাখা হয়।
১৮ জুলাই ২৭ জন নিহত হন সারা দেশে। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শিক্ষার্থীরা বলেন, সরকার পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। আন্দোলন আরো তীব্র হয়।
সরকারের পদক্ষেপ ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া
১৯ জুলাই আন্দোলনকারীরা সরকারের সংলাপ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন। ২০ জুলাই সেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারি হয়, তবুও ২৬ জন নিহত হন সংঘর্ষে। ২১ জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে তুলে নেওয়া হয়, পরে হাসপাতালে পাওয়া যায়।
২২ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কোটাব্যবস্থার সংস্কার প্রজ্ঞাপন অনুমোদিত হয়। ২৩ জুলাই তা প্রকাশ করা হয়। যদিও এরপরও আন্দোলন থামে না। ২৬ জুলাই থেকে শুরু হয় ‘ব্লক রেইড’। দেশজুড়ে ৬ হাজারের বেশি গ্রেফতার, ৫৫৫ মামলা হয়।
৬ সমন্বয়ক ও সেই ভিডিও
২৮ জুলাই ডিবির হেফাজতে থাকা ৬ আন্দোলনকারী একটি ভিডিও বার্তায় কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। তবে অন্য তিন সমন্বয়ক তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘অস্ত্রের মুখে’ ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছে। ডিবি অফিস কখনোই ছাত্রদের বিবৃতি দেওয়ার জায়গা নয় বলে তারা উল্লেখ করেন।
একদফার ঘোষণায় গতি পায় বিপ্লব
৩০ জুলাই শহীদদের স্মরণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাল ফ্রেমে প্রোফাইল পিকচার বদলানো হয়। ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির ঘোষণা আসে। ৩১ জুলাই দেশজুড়ে মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়।
৫ আগস্ট—‘ছত্রিশে জুলাই’—সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে। দুপুরে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণে ঘোষণা দেন সরকারের পতনের। দেশে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জনতার ঢল নামে গণভবন, সংসদ ভবন ও ধানমন্ডির ৩২ নম্বর পর্যন্ত।
এক বছর পর...
এক বছর পরেও আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, “আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে আমরা ভেবেছিলাম আইনের শাসনের নতুন সূচনা হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতা শুধু হাতবদল হয়েছে—সংস্কারের যে কাঠামো দরকার ছিল, তা গড়ে ওঠেনি। আগে একদল লুটত, এখন সবাই মিলে খায়।”