প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: সোমবার , ১৪ জুলাই , ২০২৫
অপরাধের লাগামছাড়া বিস্তার এবং একের পর এক নৃশংস ঘটনার প্রেক্ষাপটে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, দখল, লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই অবস্থায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ‘চিরুনি অভিযান’ চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
পুলিশ সদরদপ্তর থেকে দেশের সব জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এবং থানা অফিসার ইনচার্জদের (ওসি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—সব ধরনের অপরাধীর নতুন তালিকা করতে। এই তালিকা অনুযায়ী অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দখলবাজ ও নারী ও শিশু নির্যাতনকারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হবে।
রোববার (১৩ জুলাই) সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, মব সহিংসতা ও একের পর এক অপরাধের ঘটনায় সরকার উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, “আজ থেকে (১৩ জুলাই) চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে সন্ত্রাস ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধী সে যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এই অভিযান কতটা কার্যকর হবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।”
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘জয়েন্ট কো-অর্ডিনেশন সেন্টার’ থেকে অভিযান সমন্বয় করা হবে। এতে যৌথ বাহিনী অংশ নেবে তিনি উল্লেখ্য করেন।
পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, “চাঁদাবাজ, দখলবাজ, মাস্তান যারা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, তাদের নতুনভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কেউ বালুমহাল বা স্ট্যান্ড দখল করছে, আইন হাতে নিচ্ছে—এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, অপরাধের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসে সারাদেশে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৪৪টি, মে মাসে ৩৪১, এপ্রিল ৩৩৬, মার্চে ৩১৬, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০ ও জানুয়ারিতে ২৯৪। এ ছাড়া জুনে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা ১৯৩৩, মে মাসে ২০৮৭, এপ্রিল ২০৮৯, মার্চে ২০৫৪, ফেব্রুয়ারিতে ১৪৩০ ও জানুয়ারিতে ১৪৪০টি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেবে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৩০টি, এর মধ্যে ৬৬টি ছিল দলবদ্ধ ধর্ষণ। ২২টি ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে গণপিটুনিতে ৮৯ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ঢাকাতেই মারা গেছেন ৪৫ জন।
সম্প্রতি সংঘটিত কয়েকটি নৃশংস ঘটনা জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। পুরান ঢাকার মিটফোর্ডে লাল চাঁদ সোহাগ নামের এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। খুলনায় যুবদল নেতা মাহাবুবুর রহমান মোল্লাকে খুনের পর পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। এছাড়া চাঁদপুরে মসজিদে ইমামকে চাপাতি দিয়ে কোপানো, পল্লবীতে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে হামলা ও গুলি চালানো এবং শ্যামলীতে অস্ত্রের মুখে পোশাক-জুতা পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সহিংসতায় দেশজুড়ে থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে ৫ হাজার ৭৫৩টি অস্ত্র লুট করা হয়। এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৪ হাজার ৩৮৪টি, এখনও নিখোঁজ রয়েছে ১ হাজার ৩৬৯টি। এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে চলে গেলে নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকার ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা আরও দুই মাস বাড়িয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ১৪ জুলাই থেকে পরবর্তী ৬০ দিন পর্যন্ত এ ক্ষমতা বলবৎ থাকবে।