প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: শুক্রবার , ২৪ জানুয়ারী , ২০২৫
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ওয়ান ইলেভেনের মতো আরেকটি সরকার চান কিনা, সে প্রশ্ন তুলেছেন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম।
বৃহস্পতিবার ফেইসবুকে লেখা এক পোস্টে এ প্রশ্ন রেখেছেন তিনি।
মির্জা ফখরুলের যে বক্তব্যকে ঘিরে নাহিদের এ প্রশ্ন সেটি হলো, নিরপেক্ষ সরকার প্রসঙ্গে। বুধবার বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ সরকারের বিষয়ে কথা বলেছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যদি সরকার পূর্ণ নিরপেক্ষতা পালন করে, তাহলেই তারা নির্বাচন কনডাক্ট করা পর্যন্ত থাকবেন। তা না হলে তো নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজন হবে।”
প্রতিবারের মতো এবারও দ্রুত নির্বাচনের ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি। রাষ্ট্র সংস্কারও নির্বাচিত সরকারেরই করা উচিত, আবারও এই কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
মির্জা ফখরুলের এই নিরপেক্ষ সরকার বিষয়ক বক্তব্যকে আরেকটি ওয়াল ইলেভেনের সরকার গঠনের ইঙ্গিত বহন করছে বলে মনে করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, “১/১১ এর বন্দোবস্ত থেকেই আওয়ামী ফ্যাসিজমের উত্থান ঘটেছিল। বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যে সামনে আরেকটা ১/১১ সরকার, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা এবং গুম-খুন ও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ার আলামত রয়েছে।”
বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার আমলের (২০০১-২০০৬) শেষ দিকে একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলো লাগাতার হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি দেয়। এ কর্মসূচি ঘিরে সংঘাতময় অবস্থায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়।
তখন সেনাসমর্থিত যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে, তা পরিচিত এক-এগারোর বা ওয়ান ইলেভেনের সরকার নামে।
ওই সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যেই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতা ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হয়। অনেকেই গ্রেপ্তার হন, কেউ কেউ বিদেশে পালিয়ে যান। গ্রেপ্তার হন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা এবং বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও।
ছাত্র এবং অভ্যুত্থানের নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ৫ আগস্ট থেকেই শুরু হয়েছে বলে দাবি নাহিদের। তিনি বলেন, “৫ অগাস্ট যখন ছাত্র-জনতা রাজপথে লড়াই করছে, পুলিশের গুলি অব্যাহত রয়েছ, তখন আমাদের আপোষকামী অনেক জাতীয় নেতৃবৃন্দ ক্যান্টনমেন্টে জনগণকে বাদ দিয়ে নতুন সরকার করার পরিকল্পনায় ব্যস্ত ছিলেন (অনেকে ছাত্রদের কথাও বলেছেন সেখানে)।”
কোনও ধরনের সেনা শাসন বা জরুরি অবস্থা মেনে নেবেন না জানিয়ে নাহিদ বলেন, “আমাদেরকে বারবার ক্যান্টন্টমেন্টে যেতে বলা হলেও আমরা যেতে অস্বীকার করি। শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবনে আলোচনা ও বার্গেনিংয়ের মাধ্যমে ড. ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
“আমরা চেয়েছিলাম ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে একটা জাতীয় সরকার। জাতীয় সরকার হলে ছাত্রদের হয়ত সরকারে আসার প্রয়োজন হতো না। জাতীয় সরকার অনেকদিন স্থায়ী হবে এই বিবেচনায় বিএনপি জাতীয় সরকারে রাজী হয় নাই।”
তবে অভ্যুত্থানের পরে দেশে জাতীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি ছিল বলে মনে করেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “অথচ বিএনপি জাতীয় সরকারের কথা বলছে সামনের নির্বাচনের পরে। ছাত্ররাই এই সরকারের এবং বিদ্যমান বাস্তবতার একমাত্র ফ্যাক্টর যেটা ১/১১ এর সরকার থেকে বর্তমান সরকারকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করে।
“বিএনপি কয়েকদিন আগে মাইনাস টু এর আলোচনা করলেও এখন ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করার জন্য নিরপেক্ষ সরকারের নামে আরেকটি ১/১১ সরকারের প্রস্তাবনা করছে।”
নাহিদ ইসলাম মনে করেন, এ ধরনের পরিকল্পনা গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে এবং ছাত্র-জনতা কোনোভাবেই এটা মেনে নেবে না।
নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে কোনও পরিবর্তন আসতে পারে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বিবিসি বাংলাকে বলেন, “নিরপেক্ষতার প্রশ্ন আসতে পারে। কেননা, এখানে আমরা জিনিসটা লক্ষ্য করছি যে, আপনার ছাত্ররা তারা একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করার কথা চিন্তা করছেন। সেখানে যদি ছাত্রদের প্রতিনিধি এই সরকারে থাকে, তাহলে তো নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না। ওইটা হচ্ছে, সম্ভাব্য কথা। কিন্তু যদি তারা মনে করে যে, (সরকারে) থেকেই তারা নির্বাচন করবেন, তাহলে তো রাজনৈতিক দলগুলো মেনে নেবে না।”
অন্যদিকে নাহিদ ইসলাম মনে করেন, বর্তমান সরকার জাতীয় সরকার না হলেও সরকারে আন্দোলনের সব পক্ষেরই অংশীদারত্ব রয়েছে।
নাহিদ বলেন, “সব পক্ষই নানান সুবিধা ভোগ করছে। সরকার গঠনের আগেই ৬ অগাস্ট অ্যাটর্নি জেনারেল এবং পুলিশের আগের আইজির নিয়োগ হয়েছিল যারা মূলত বিএনপির লোক। এরকমভাবে সরকারের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত নানান স্তরে বিএনপিপন্থী লোকজন রয়েছে। নির্বাচনের নিরপেক্ষতার কথা বললে এই বাস্তবতায়ও মাথায় রাখতে হবে।”
রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন, সংস্কার, নতুন সংবিধান, জুলাই ঘোষণা সব ইস্যুতেই বিএনপির বিরুদ্ধাচারণের কথা মনে করিয়ে দেন নাহিদ।
তিনি বলেন, “অথচ এগুলা কোনোটাই ছাত্রদের দলীয় কোনও দাবি ছিল না। কিন্তু দেশের স্থিতিশীলতা, বৃহত্তর স্বার্থ এবং জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার জন্য ছাত্ররা বারবার তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে।
“কিন্তু এর মানে এই না যে গণতন্ত্রবিরোধী ও অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাবিরোধী কোনও পরিকল্পনা হলে সেখানে আমরা বিন্দু পরিমান ছাড় দেবো। আওয়ামী লীগ বিষয়ে ভারতের প্রধান দলগুলোর মধ্যে ঐক্য সম্ভব হয়েছে অথচ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বিষয়ে আমরা ঐক্য করতে পারিনি, এত হত্যা ও অপরাধের পরেও। হায় এই ‘জাতীয় ঐক্য’ লইয়া আমরা কি রাষ্ট্র বানাবো!”
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন দাবিতে বিএনপির বিরোদীতার বিষয়েও মির্জা ফখরুলের কাছে জানতে চাওয়া হয়। কেন বিএনপি রাষ্ট্রপতি অপসারণ, জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র কিংবা সাম্প্রতিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ইস্যুর বিরোধীতা করছে তার স্পষ্ট জবাব দেন বিএনপি মহাসচিব।
তিনি বলেন, “আপত্তির কারণ খুব সঙ্গত কারণ। আমরা তো একটা সংবিধানের অধীনে আছি। রাষ্ট্রের যে সংবিধান, সেই সংবিধানের অধীনে আমরা আছি। এই সরকারও শপথ নিয়েছে সেই সংবিধানের অধীনে। সেখানে রাষ্ট্রপতিকে যে অপসারণ করবে, সেটা কে করবে? এটা এক।
“দুই নম্বর হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি আনবেন কাকে? তিন নম্বর হচ্ছে, এটার লেজিটেমেসি কার হাতে থাকবে? পার্লামেন্ট নেই। সুতরাং ওই প্রশ্নটাকে আমরা মনে করি যে, অবাস্তব প্রশ্ন।”
এ মুহূর্তে দেশের মূল সমস্যার সমাধান হিসেবে দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করাকেই দেখছেন মির্জা
এছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র নিয়ে তাদের সঙ্গে আগে থেকে কোনও আলোচনা করা হয়নি বলেন দাবি করেন। আন্দোলনের পাঁচ মাস পর এই ঘোষণাপত্রের কোনও যুক্তি আছে কিনা, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বিএনপির এই অবস্থান প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে নাহিদ তার পোস্টে লেখেন, বাংলাদেশকে সহজেই বিভাজিত করা যায় কারণে বাংলাদেশকে দুর্বল করা সহজ।
“আমি মনে করিনা সমগ্র বিএনপি এই অবস্থান গ্রহণ করে। বরং বিএনপির কর্মী সমর্থকদের বড় অংশই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন চায়। বিএনপির দেশপ্রেমিক ও ত্যাগী নেতৃত্বকে আহবান করব, ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে না গিয়ে ছাত্র-জনতার সাথে বৃহত্তর ঐক্য ও সংহতির পথ বেছে নিন।”