প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার , ৯ অক্টোবর , ২০২৫
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সময়সূচি ও পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য থেকেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার শেষ হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় আলোচনায় পূর্ণ ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
তবে কমিশন জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতামত ও দলগুলোর প্রস্তাব একত্র করে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তারা সরকারের কাছে চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দেবে।
কমিশনের প্রত্যাশা, ১৫ থেকে ১৭ অক্টোবরের মধ্যেই জুলাই সনদে স্বাক্ষর সম্পন্ন হবে।
বুধবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল তিনটায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে পঞ্চম ও শেষ দিনের বৈঠক শুরু হয় এবং তা শেষ হয় রাত সোয়া ১১টায়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি নিউজে সরাসরি সম্প্রচারিত হয় এই আলোচনাটি।
শেষ দিনের আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলো মূলত দুই শিবিরে বিভক্ত ছিল। বিএনপিসহ কয়েকটি দল জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের পক্ষে থাকে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট করার প্রস্তাব দেয়। গণভোটের প্রশ্নপত্র, প্রক্রিয়া ও ভিন্নমতের প্রতিফলন নিয়েও একমত হতে পারেনি তারা।
ছয়টি সংস্কার কমিশনের মোট ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে তৈরি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ। খসড়া প্রস্তুত হলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নির্ধারণে মতৈক্যের অভাবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বিএনপি প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন আহমদ আলোচনায় বলেন, জাতীয় নির্বাচনের অল্প সময় বাকি থাকায় আলাদা করে গণভোট আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। একই দিনে ভোট হলে ব্যয়ও কমবে এবং প্রশাসনিক জটিলতা এড়ানো যাবে। বিএনপি প্রস্তাব দেয়, সনদের ভিত্তিতে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে অধ্যাদেশের মাধ্যমে গণভোটের আইনি কাঠামো গঠন করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, গণভোটে সনদ অনুমোদিত হলে পরবর্তী সংসদ সেটি বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। প্রয়োজন হলে সংসদ ভবিষ্যতে সংশোধন আনতে পারবে, তবে মূল সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতেই হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, সনদে যেসব বিষয়ে দলগুলোর ভিন্নমত রয়েছে, সেগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত। প্রতিটি দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সেই ভিন্নমতের প্রতিফলন ঘটাতে পারে।
জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের পক্ষে থাকে। তাদের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে। একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট হলে প্রক্রিয়াগত জটিলতা দেখা দিতে পারে।
জামায়াতের প্রতিনিধি আইনজীবী শিশির মনির প্রস্তাব করেন, একটি বিশেষ “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ” জারি করা হোক, যার তফসিলে পুরো সনদ যুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনে এটিকে “গাঠনিক ক্ষমতা” দিয়ে অনুমোদন করতে হবে, যাতে সংস্কারগুলো টেকসই হয়।
প্রথমে নির্বাচনদিনে গণভোটের পক্ষে থাকলেও পরে অবস্থান পাল্টায় এনসিপি। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন বলেন, সংস্কারের টেকসই বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে আগে একটি আদেশ জারি করে সেই ভিত্তিতে গণভোট আয়োজন করতে হবে। পাশাপাশি পরবর্তী সংসদকে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ ক্ষমতা দিতে হবে।
আলোচনায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বিএনপি ও জামায়াতকে একসঙ্গে বসে সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানান। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের হাসনাত কাইয়ূম ও গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকিও প্রস্তাব দেন, কমিশনের বাইরে দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে মতপার্থক্য কমানোর চেষ্টা করতে পারে।
সমাপনী বক্তব্যে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী—
১. জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষ আদেশ জারি করতে হবে।
২. ওই আদেশের অধীনে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
৩. গণভোটে দুটি প্রশ্ন থাকবে—একটি ঐকমত্যে পৌঁছানো প্রস্তাবগুলো নিয়ে, অন্যটি ভিন্নমত থাকা বিষয়গুলো নিয়ে।
৪. নির্বাচনের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও নতুন সংসদ গঠিত হবে।
৫. গণভোটে অনুমোদন পেলে সংসদ জুলাই সনদের সংস্কারসমূহ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ মিলিয়ে দু–এক দিনের মধ্যেই সরকারকে বিস্তারিত সুপারিশ পাঠানো হবে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে গত বছরের অক্টোবরে সরকার ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে—সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। ফেব্রুয়ারিতে এসব কমিশন তাদের প্রস্তাব জমা দেয়। পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়, যার নেতৃত্বে আছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
দুই দফা আলোচনায় মোট ৮৪টি প্রস্তাবের খসড়া তৈরি হয়, তবে বাস্তবায়নের পথনির্দেশ নিয়ে মতৈক্য না হওয়ায় সনদে স্বাক্ষর বিলম্বিত হয়। বুধবারের আলোচনার মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল।