প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: শনিবার , ২৭ সেপ্টেম্বর , ২০২৫
আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির কথা জাতিসংঘকে জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের পাশাপাশি দেশে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে ভাষণ দেন অধ্যাপক ইউনূস। এতে তিনি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান–পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপ, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমস্যা, যুদ্ধ-সংঘাত, এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গঠনের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেন।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “গত বছর আমি এই সভায় দাঁড়িয়েছিলাম সদ্য গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত একটি দেশের রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরতে। আজ আমি জানাতে এসেছি, সেই রূপান্তরের যাত্রায় আমরা কতটা অগ্রসর হয়েছি।”
তিনি জানান, জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছিল সরকারের মূল লক্ষ্য। নির্বাহী আদেশে পরিবর্তন না এনে সরকার বেছে নিয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই সংস্কারের কঠিন পথ।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “আমরা ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছি। লক্ষ্য—একটি ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন, যেখানে আর কোনো স্বৈরশাসক জন্ম নিতে পারবে না।”
তিনি আরও জানান, ‘জুলাই ঘোষণা’র মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে সংস্কার কার্যক্রম সময়াবদ্ধভাবে এগোচ্ছে। আগামী নির্বাচনে যে দলই জিতুক, এই সংস্কারযাত্রা আর থামবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে সুশাসন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “জবাবদিহিহীন উন্নয়ন ভঙ্গুর। অতীতের রাজনৈতিক হীনস্বার্থ ও দুর্নীতিমূলক প্রকল্পগুলো অর্থনীতিকে নাজুক করে তুলেছিল।”
তিনি জানান, বিগত সরকারের সময়ে শত শত কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। পাচার হওয়া এই সম্পদ ফেরত আনা সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকার। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহায়তা ছাড়া এ প্রচেষ্টা সফল হবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
প্রধান উপদেষ্টা আহ্বান জানান, “যেসব দেশ ও প্রতিষ্ঠান এই সম্পদ গচ্ছিত রেখেছে, তারা যেন প্রকৃত মালিক—কৃষক, শ্রমিক ও করদাতাদের কাছে সম্পদ ফিরিয়ে দেয়।”
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা, মিথ্যা সংবাদ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ডিপফেক এখন গুরুতর হুমকি।” তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ প্রবণতা রোধের আহ্বান জানান।
নারীর ক্ষমতায়নকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের মেয়েরা শ্রেণিকক্ষ থেকে বোর্ডরুম, গবেষণাগার থেকে খেলার মাঠ—সব জায়গায় সাফল্যের ছাপ রাখছে।”
সম্প্রতি মহিলা ফুটবল দলের আঞ্চলিক সাফল্যের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “এ সাফল্য লাখো মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।”
অধ্যাপক ইউনূস জানান, বর্তমানে প্রায় ছয় হাজার বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে জাতিসংঘের দায়িত্ব পালন করছেন। এতদিনে ১৬৮ জন শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মিয়ানমারের চলমান সংঘাত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ক্রমেই কঠিন হচ্ছে।
তিনি রোহিঙ্গাদের প্রান্তিকীকরণ বন্ধে রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানান এবং তহবিল সংকট মোকাবিলায় দাতাদের সহায়তা বৃদ্ধির অনুরোধ করেন।
ইসরায়েলের গাজায় নির্বিচার গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “শিশুরা অনাহারে মারা যাচ্ছে, হাসপাতাল ও স্কুল ধ্বংস হচ্ছে—মানবজাতির পক্ষ থেকে এ হত্যাযজ্ঞ বন্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে না।”
তিনি পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান।
সর্বোপরি, জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, স্বচ্ছতা, সংস্কার, সম্পদ ফেরত আনা, নারী নেতৃত্ব ও বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “আমাদের যাত্রা এখন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই পরিবর্তনের দিকে—যেখানে আর কোনো স্বৈরাচার জন্ম নেবে না, আর ন্যায়বিচার হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি।”