চবি প্রতিনিধি প্রকাশিত: মঙ্গলবার , ২ সেপ্টেম্বর , ২০২৫
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ও নিকটবর্তী জোবরা গ্রামে শিক্ষার্থী ও গ্রামবাসীর সংঘর্ষের পর চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাত পর্যন্ত এলাকায় ১৪৪ ধারা বলবৎ রয়েছে এবং সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির যৌথ টহল চলছে। এ কারণে নতুন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে শিক্ষার্থী ও গ্রামবাসীর চোখেমুখে আতঙ্ক ও ক্ষোভ স্পষ্ট।
শনিবার (৩০ আগস্ট) রাত থেকে রোববার দিনভর চলা সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ইমতিয়াজ আহমেদ (২৪) ও সমাজতত্ত্ব বিভাগের মামুন মিয়া (২৩)-কে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের নাইমুল ইসলামকে (২৪) ঢাকায় নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, তাদের অবস্থাই সবচেয়ে সংকটজনক। আহতদের অনেককে মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন অংশে জখম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ঘটনার নেপথ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের দুই নেতা—ফয়সাল মাহমুদ ত্রিশাদ ও জহির উদ্দিন চৌধুরী টিটুর নাম উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তারা মুখোশ পরে দা ও রামদা নিয়ে হামলা চালায় এবং স্থানীয়দের উসকানি দেন। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক কামাল উদ্দিন নিজ চোখে এ হামলা দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। তবুও সোমবার রাত পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি, হামলাকারীদেরও গ্রেপ্তার করা হয়নি।
সংঘর্ষের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পরীক্ষা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একাংশ চবি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, ভিসি ড. ইয়াহইয়া আখতার রোববার দিনভর শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, অথচ শিক্ষার্থীরা মার খাচ্ছিলেন। ভিসি যদি বিষয়টি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতেন, পরিস্থিতি এ রকম ভয়াবহ রূপ নিত না। নারী শিক্ষার্থীরাও ভিসির বক্তব্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
অন্যদিকে, সহকারী প্রক্টর নাজমুল হোসাইন দাবি করেছেন, দুই শিক্ষার্থী ইট নিক্ষেপ করে সংঘর্ষ উসকে দিয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা ভবনের তালা ভেঙে ১৩০টি রামদা নিয়ে গেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন পর আগামী ১২ অক্টোবর চাকসু নির্বাচন হওয়ার কথা। রোববার প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল খসড়া ভোটার তালিকা। শিক্ষার্থী ও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই সংঘর্ষ চাকসু নির্বাচন ঘিরে শক্তি প্রদর্শনেরই অংশ। একাধিক সংগঠন নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে গিয়ে উল্টো সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিপদে ফেলেছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সাবেক আমির শাহজাহান চৌধুরী দাবি করেছেন, জাতীয় নির্বাচন বানচালের জন্য কুচক্রী মহল এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তার মতে, এটি শিক্ষার্থী-গ্রামবাসীর দ্বন্দ্ব নয়, বরং পরিকল্পিত হামলা।
জোবরা গ্রামে কমপক্ষে দুই হাজার শিক্ষার্থী ভাড়া বাসায় থাকেন। টিউশনি করে তারা পড়ালেখার খরচ চালান এবং বাসা ভাড়া দিয়ে গ্রামবাসী উপকৃত হন। অতীতে এমন ঘটনা ঘটেনি। ফলে শিক্ষার্থী-গ্রামবাসীর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কে এবার যে বড় ধরনের চিড় ধরল, তা সহজে পূরণ হবে না বলে মনে করছেন অনেকে। দোকানপাট ভাঙচুর, বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটে গ্রামবাসীরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
শিক্ষার্থী-গ্রামবাসীর সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব চেষ্টা করছে। এ জন্য উপ-উপাচার্য কামাল উদ্দিনকে প্রধান করে ২১ সদস্যের তদন্ত ও সমঝোতা কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর মনে প্রশ্ন—আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া এ সম্পর্ক জোড়া লাগা কতটা সম্ভব।
এদিকে সংঘর্ষের কারণে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রাস্তাঘাট ও দোকানপাট ফাঁকা, মানুষজন আতঙ্কে ঘরে অবস্থান করছে। জরুরি অবস্থায় প্রায় নিঃশব্দ হয়ে পড়েছে চবি ক্যাম্পাস ও জোবরা গ্রাম।