প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: শনিবার , ১০ মে , ২০২৫
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ভারতের সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে একটি সুপরিকল্পিত ও নিখুঁত সামরিক হামলা চালিয়েছে। ওই অভিযানে পাকিস্তান ও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে অবস্থিত ২১টি জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু ছিল। আর এর প্রতিক্রিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত দেশ পাকিস্তান পাল্টা হামলায় নামে ৭ ও ৮ মে’র মাঝরাতে।
৮ মে রাতে পাকিস্তান ভারতের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোর দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁক নিক্ষেপ করে। হামলা হয় জম্মু, পাঞ্জাব ও রাজস্থান রাজ্যের ওপর। তবে ভারত তার উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (এস-৪০০) ব্যবহার করে এই সব হামলা প্রতিহত করে ও পাল্টা জবাব দেয়।
এই হামলার মাধ্যমে পাকিস্তানের চীন-নির্ভরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান এই হামলায় চীনে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে। নিচে এসব অস্ত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
অপারেশন সিঁদুর শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তান ৭ ও ৮ মে’র মধ্যরাতে ভারতের বিরুদ্ধে হামলা চালায়। এর জবাবে ভারতের পাল্টা হামলায় লাহোরে অবস্থিত একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট ধ্বংস হয় বলে দাবি করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। অবশ্য শুক্রবার দুপুরে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এমন দাবি অস্বীকার করে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এইচকিউ-৯ পাকিস্তানকে দিয়েছে চীন। এটি রাশিয়ার এস-৩০০ প্ল্যাটফর্মের অনুকরণে তৈরি। এটি একটি দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা (এসএএম)। এতে উন্নত রাডার ট্র্যাকিং ও গাইডেন্স প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এটি চীনের প্রতিরক্ষা রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত এবং পাকিস্তান এটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে মোতায়েন করেছে।
এইচকিউ-৯ এর মূল সংস্করণ ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এইচকিউ-৯বি সংস্করণে এই পরিসীমা বাড়িয়ে ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়েছে। এটি ৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় উড়তে থাকা বস্তুকেও লক্ষ্য করতে পারে।
অস্ত্র হস্তান্তর ডাটাবেজ সিপ্রি (এসআইপিআরআই) অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে পাকিস্তান চীন থেকে এইচকিউ-১৬ সংস্করণের ৯টি ইউনিট দুটি পৃথক চুক্তির মাধ্যমে কিনেছে। এসব অস্ত্রগুলোর মোট মূল্য ছিল ৫৯৯ মিলিয়ন ডলার।
জে-১০সি ফাইটার জেট
বর্তমান এই সামরিক উত্তেজনার সময়ে পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা চীনে তৈরি জে-১০সি ফাইটার জেট ব্যবহার করেছে ভারতের বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে।
এক ইঞ্জিন বিশিষ্ট এই যুদ্ধবিমানটি বহু ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। এটি নির্মান করেছে চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপ। ২০০৩ সাল থেকে এটি চীনের বিমান বাহিনীতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
চীনের বাইরে পাকিস্তানই একমাত্র দেশ যারা জে-১০সি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২০ সালে পাকিস্তান জে-১০সি এর রপ্তানি সংস্করণ জে-১০সিই মোট ৩৬টি এবং ২৫০টি পিএল-১৫ই ক্ষেপণাস্ত্র অর্ডার দেয়। ২০২২ সালে প্রথম দফায় ৬টি বিমান পাকিস্তানে পৌঁছায়। বর্তমানে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ২০টি জে-১০সি বিমান সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চীনে এই বিমানকে “ভিশাস ড্রাগন” নামেও ডাকা হয়। এর নকশা অনেকটা ফরাসি মিরাজ সিরিজের যুদ্ধবিমানের মতো। এই জেট একসঙ্গে ছয়টি ৫০০ কেজি ওজনের লেজার-গাইডেড বোমা, সাধারণ বোমা, কিংবা ৯০ মিলিমিটারের রকেট বহন করতে পারে। এছাড়াও এতে একটি ২৩ মিমি ব্যারেলযুক্ত কামান রয়েছে।
পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র
বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে চীনে তৈরি পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এটি একটি দূরপাল্লার, দৃষ্টিসীমার বাইরে থেকে আঘাত হানতে সক্ষম আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র। এটি যুদ্ধবিমান থেকে ছোড়া হয়। ক্ষেপণাস্ত্রটি চীনের অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন অব চায়না ২০১১ সালে তৈরি করা শুরু করে এবং ২০১২ সালে প্রথম পরীক্ষা চালায়।
পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রে রয়েছে একটি ডুয়াল-পালসড (দ্বিগুণ শক্তির) সলিড প্রপেলান্ট রকেট এবং অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিকালি স্ক্যানড অ্যারে রাডার। এই রাডার প্রযুক্তির সঙ্গে একটি টু-ওয়ে ডেটালিংক যুক্ত থাকে, যা ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও মাঝপথে দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম করে। ফলে এটি একটি বহু-কার্যকর ও উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত।
এই ক্ষেপণাস্ত্র ২০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এর গতি হয় ম্যাক ৫ (শব্দের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি)। পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র বর্তমানে চীনের চেংদু জে-২০, জে-১০সি ও জে-১৬ যুদ্ধবিমানে ব্যবহার করা হয়।
পাকিস্তান এই পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম আন্তর্জাতিক গ্রাহক।
এসএইচ-১৫ আর্টিলারি গান
অপারেশন সিঁদুরের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সীমান্তে অব্যাহতভাবে গুলি ছুড়ছে চীনে তৈরি এসএইচ-১৫ মিমি মাউন্টেড গান সিস্টেম (এমজিএস) ব্যবহার করে। এই ধরনের আর্টিলারি গান একটি মোবাইল ট্রাকের ওপর বসানো থাকে। ফলে এটির চলাফেরার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং এটি দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে ‘শুট অ্যান্ড স্কুট’ কৌশলে কাজ করতে পারে।
২০১৯ সালে পাকিস্তান এই এসএইচ-১৫ গান সিস্টেম সংগ্রহ করে। এটি সাধারণ গোলাবারুদ ব্যবহার করে ২০ কিলোমিটার এবং রকেট সহযোগিতায় ৫৩ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এই হাউইটজার প্রতি মিনিটে ৪ থেকে ৬ রাউন্ড গুলি ছুঁড়তে পারে। এটি নতুন শানজি সামরিক ট্রাকের ওপর তৈরি। এর কেবিন সাঁজোয়া এবং এতে মোট ছয় সদস্যের একটি গানার দল বসতে পারে। এই সাঁজোয়া কেবিন ছোট অস্ত্র এবং গোলার টুকরার আঘাত থেকে রক্ষা করে।
এসএইচ-১৫ আর্টিলারি গানগুলোতে বিল্ট-ইন জিপিএস ও ইনর্শিয়াল ন্যাভিগেশন সিস্টেম রয়েছে। এর মধ্যেমে এটি দুর্গম অঞ্চলেও নির্ভুল ও দ্রুত আঘাত হানতে পারে। কাশ্মীরের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে শুরু করে সিন্ধুর মরুভূমি এবং পাঞ্জাবের আধা-শহুরে এলাকায় পাকিস্তানের নানা রকম পরিবেশে এটি কার্যকরভাবে ব্যবহারযোগ্য।
চীনে তৈরি ড্রোন
পাকিস্তান ঠিক কোন ধরনের ড্রোন ব্যবহার করে ভারতের ওপর হামলা চালাচ্ছে তা নিশ্চিত নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পাকিস্তানের ড্রোন ভান্ডারের বড় একটি অংশই চীন থেকে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে উইং লুং দ্বিতীয় ও সিএইচ-৪ ড্রোন।
উইং লুং দ্বিতীয় ড্রোন হলো চীনের অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশনের তৈরি করা একটি নতুন প্রজন্মের মাঝারি উচ্চতা ও দীর্ঘ সময় ধরে উড়তে সক্ষম ও হামলাযোগ্য ড্রোন। ড্রোনটির দৈর্ঘ্য ১১ মিটার, পাখার বিস্তার ২০ দশমিক ৫ মিটার ও উচ্চতা ৪ দশমিক ১ মিটার। এটি উইং লুং ইউএভির একটি উন্নত সংস্করণ। ২০০৮ সালে চীনের বিমান বাহিনীতে প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল এটি।
অন্যদিকে সিএইচ-৪ ড্রোন চীনের অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কর্পোরেশন তৈরি করেছে। এটি একটি মাঝারি উচ্চতার, দীর্ঘ সময় উড়তে সক্ষম ইউএভি। এর আকৃতি অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের এমকিউ-৯-রিপার ড্রোনের মতো।
এই ড্রোন টানা ১৪ ঘণ্টা উড়তে পারে এবং ১,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত অভিযান চালাতে পারে। এটি বিরোধপূর্ণ এলাকায় উড়তে পারদর্শী এবং তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ বা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। ড্রোনের ৩৪৫ কেজি বহনক্ষমতা রয়েছে। ফলে এটি এআর-১ লেজার-গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র, এফটি-৯ বোমা এবং শত্রুর রাডার ধ্বংসকারী ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে।
পাকিস্তানে চীনের সামরিক সহায়তা
ভারত ও পাকিস্তানের চলমান উত্তেজনায় চীন-নির্ভরতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বিশ্বব্যাপী অস্ত্র হস্তান্তর নিয়ে গবেষণাকারী সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে পাকিস্তানের অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতা ক্রমশ বেড়েছে। চীনের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে সরবরাহ করা হয়েছে উন্নত যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পাকিস্তানের সামরিক সরঞ্জামের মোট আমদানির ৮১ শতাংশই এসেছে চীন থেকে। এরপর নেদারল্যান্ডস (৫ দশমিক ৫ শতাংশ) ও তুরস্ক (৩ দশমিক ৮ শতাংশ) ছিল তালিকায়।
এছাড়া চীন ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এখন আরও আধুনিক যৌথ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে — যা আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। এসব মহড়ায় থাকে যুদ্ধের অনুকরণে অনুশীলন এবং এমনকি ক্রু পরিবর্তনেরও প্রশিক্ষণ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির সিনিয়র ফেলো ক্রেইগ সিংলেটন সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “চীনের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিশানা নির্ধারণ প্রযুক্তির সহায়তা পাকিস্তানের কৌশলগত ভারসাম্যে পরিবর্তন আনছে। এটি আর শুধু ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সংঘাত নয়, বরং চীনা প্রতিরক্ষা রপ্তানির মাধ্যমে গোটা অঞ্চলের প্রতিরোধ কৌশল নতুনভাবে গড়ে উঠছে।”
তথ্যসূত্র : ফার্স্টপোস্ট ও সকালসন্ধ্যা