আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: মঙ্গলবার , ২২ এপ্রিল , ২০২৫
(উপরে বাঁ থেকে ঘড়ির কাঁটার দিকে): পিয়েরবাত্তিস্তা পিৎজাবালা, পিয়েত্রো প্যারোলিন, পিটার এরডো, জ্যঁ-মার্ক আভেলিন
একজন রোমান ক্যাথলিক পোপ মারা যাওয়ার পর পরবর্তী পোপ কে হবেন, তার জল্পনা-কল্পনা বেশিরভাগ সময়ে সঠিক হয় না। ২০১৩ সালে পোপ ফ্রান্সিসের নির্বাচিত হওয়ার আগে অনেকে তাকে গোণাতেই ধরেননি।
ধারণা আর বাস্তবতার অনেক ফারাকের কারণে এক্ষেত্রে ইতালীয় একটি প্রবাদও রয়েছে; যেখানে এ বিষয়ে বাজি ধরতে বা বিশ্বাস রাখার বিষয়ে দেওয়া হয়েছে সতর্কতা। সারা পৃথিবীর কার্ডিনালরা কনক্লেভ বা মন্ত্রণাসভায় বসে পরবর্তী পোপ নির্বাচন করেন।
কথায় আছে, ‘যে পোপ হিসাবে কনক্লেভে ঢোকে, সে কার্ডিনাল কেবল কার্ডিনাল হয়েই বের হয়।’ অর্থাৎ যার নাম বেশি ফলাও হয়, তার বাদ পড়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি।
তার মধ্যে, এবার ভবিষদ্বাণীকে আরও কঠিন করে দিয়ে গেছেন পোপ ফ্রান্সিস। কেননা, কলেজ অব কার্ডিনালসে বৈচিত্র্য আনার জন্য তিনি অল্প সময়ের ব্যবধানে বহুজনকে নিয়োগ দিয়েছেন।
এরপরও সারা পৃথিবীর তাবৎ সংবাদমাধ্যম পোপ ফ্রান্সিসের উত্তরসূরী কে হবেন, তা নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী প্রকাশ করেছে। রয়েছে পর্যবেক্ষণদের বিশ্লেষণও।
যাদের নাম উঠে আসছে, তাদের কেউ কেউ ফ্রান্সিসের প্রগতিশীল এজেন্ডা সামনে এগিয়ে পারেন। আর কেউ কেউ চিরাচরিত ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন।
পিয়েরবাত্তিস্তা পিৎজাবালা, ইতালি
৬০ বছর বয়সি পিয়েরবাত্তিস্তা পিৎজাবালা ভ্যাটিকানের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা। পোপের উত্তরসূরী হিসাবে এগিয়ে থাকা ব্যক্তি হিসাবে ভাবা হচ্ছে তাকে।
যদিও তিনি মাত্র ২০২৩ সালেই কার্ডিনাল হয়েছেন, তবুও বিশ্বের অন্যতম উত্তপ্ত সংঘাতময় অঞ্চলে কাজের অভিজ্ঞতা তাকে খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে এসেছে।
কার্ডিনাল পিৎজাবালা হতে পারেন ১৯৭৮ সালে নির্বাচিত জন পল প্রথম-এর পর প্রথম ইতালীয় পোপ। তবে, বিশেষজ্ঞরা এও বলছেন, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও বিবেচনার কারণে তাকে ভ্যাটিকানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় জেরুজালেমে কাটিয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুন: নতুন পোপ নির্বাচন যেভাবে
অন্যত্র কাজের সুবাদে ধর্মীয় মতবাদ নিয়ে বিতর্ক এড়িয়ে গেছেন পিৎজাবালা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ কারণে কলেজ অব কার্ডিনাল তাকে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে দিতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এই ভূমিকার জন্য তিনি খুবই কম বয়সি।
পিয়েত্রো প্যারোলিন, ইতালি
৭০ বছর বয়সি কার্ডিনাল পিয়েত্রো প্যারোলিন ২০১৩ সাল থেকে পোপ ফ্রান্সিসের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ওই সময়ে পোপ নির্বাচিত হওয়ার পর ফ্রান্সিস তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
এই দায়িত্বপালনকালে তিনি বৈদেশিক নীতি পরিচালনার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ গির্জা বিষয়ক কাজের তত্ত্বাবধানও করেন।
মৃদুভাষী ইতালীয় এবং মৃদু স্বভাবের মধ্যপন্থী এই কার্ডিনাল প্যারোলিন কুরিয়া নামে পরিচিত গীর্জার কেন্দ্রীয় প্রশাসনের পাশাপাশি ভ্যাটিকানের বিশাল আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গেও গভীরভাবে পরিচিত।
তিনি ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কূটনীতিক হিসাবে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দেখভালকারী দপ্তরে আন্ডার সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেছেন।
ইংরেজি, ফরাসি, ইতালীয় এবং স্প্যানিশ ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন তিনি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলনে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানব পাচার নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন তিনি।
তিনি একজন এশিয়ার বিশেষজ্ঞও। ভ্যাটিকান পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন এবং ভিয়েতনামের সঙ্গে ভ্যাটিকানের সম্পর্কের যে অগ্রগতি, সেখানে মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন পিয়েত্রো প্যারোলিন।
জ্যঁ-মার্ক আভেলিন, ফ্রান্স
৬৬ বছর বয়সি জ্যঁ-মার্ক আভেলিন বর্তমানে আর্চবিশপ অব মার্সেই পদে রয়েছেন। ফরাসি ক্যাথলিক সার্কেলে তিনি জন চতুর্বিংশ হিসাবে পরিচিত। গত শতকের ষাটের দশকের পোপ ত্রয়োবিংশ-এর গোলগাল চেহারার মিল থাকার কারণে তাকে এ নামে ডাকা হয়।
পোপ ফ্রান্সিসও একদা বলেছিলেন, তিনি চান তার উত্তরসূরী যেন ‘জন চতুর্বিংশ’ নাম নেন। যেভাবে নিজের পছন্দের নাম পোপ ফ্রান্সিস নিয়েছিলেন হোর্হে মারিও বেরগোগলিও।
সাদাসিধে, সহজ-সরল স্বভাব এবং রসিকতা প্রিয় আভেলিনের আদর্শিক অবস্থানও অনেকটা পোপ ফ্রান্সিসের মতো। বিশেষ করে অভিবাসন এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
তিনি একজন রাশভারী বুদ্ধিজীবী। ধর্মতত্ত্বে ডক্টরেট এবং দর্শনে ডিগ্রি রয়েছে তার।
আলজেরিয়ার একটি স্প্যানিশ অভিবাসী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আলজেরিয়ায় স্বাধীনতার পর তার পরিবার ফ্রান্সে চলে আসে। জীবনের বেশিরভাগ সময় মার্সেইতে কাটিয়েছেন।
আরও পড়ুন: মারা গেলেন পোপ ফ্রান্সিস
পোপ ফ্রান্সিসের অধীনে ক্যারিয়ারে অনেক দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে গেছেন আভেলিন। তিনি ২০১৩ সালে বিশপ, ২০১৯ সালে আর্চবিশপ এবং তিন বছর পর কার্ডিনাল হন।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ভূমধ্যসাগরীয় বিষয়গুলির উপর একটি আন্তর্জাতিক চার্চ সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে অবস্থান আরও এগিয়ে যায়। সে সম্মেলনে তারকা অতিথি ছিলেন পোপ ফ্রান্সিস।
যদি ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীদের শীর্ষ এই পদ পান, তাহলে ১৪ শতকের পর প্রথম ফরাসি পোপ হবেন আভেলিন। উত্তাল সেই সময়ে পোপ পদটি গিয়েছিল অ্যাভিগননে।
আর তিনিই হবেন জন পল দ্বিতীয়ের পর সর্বকনিষ্ঠ পোপ। তিনি ইতালীয় ভাষা বোঝেন কিন্তু বলতে পারেন না। রোমের বিশপ পদধারী এবং রোমান ক্ষমতার খেলার শীর্ষ পদে আসা ব্যক্তির জন্যই এটা একটা বড় অযোগ্যতা।
পিটার এরডো, হাঙ্গেরি
৭২ বছর বয়সি এই হাঙ্গেরিয়ান যদি নির্বাচিত হন, তাহলে পিটার এরডো হবেন বর্তমান অবস্থার বিপরীতমুখী পোপ। রক্ষণশীল এই কার্ডিনাল সেতুবন্ধন রচনা করতে অনাগ্রহী।
ইউরোপীয় ও আফ্রিকার গীর্জার সঙ্গে বিস্তৃত যোগাযোগের কারণে ২০১৩ সালের কনক্লেভেও তাকে পোপ হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা হয়েছিল। নিউ ইভানজেলাইজেশনের অগ্রপথিক হিসাবেও দেখা হয় তাকে।
যে মতবাদে উন্নত ধর্মনিরপেক্ষ দেশগুলোর সঙ্গে ক্যাথলিকদের সম্পর্ক পুনর্জ্জীবনের কথা বলা হয় এবং এটা অনেক কার্ডিনালের প্রধান অগ্রাধিকারও।
ধর্মতত্বে রক্ষণশীলদের মধ্যে অগ্রগামী তিনি এবং ইউরোপজুড়ে নানা বক্তৃতায় তিনি প্রচার করে থাকেন, খ্রীস্ট ধর্মের গোড়া ওই মহাদেশে।
অবশ্য, তাকে বাস্তববাদী হিসাবেও দেখা গেছে এবং ঐতিহ্যের ধারক অংশের ধর্মীয় নেতাদের মতো করে তিনি কখনও পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধে জড়াননি।
এর মধ্যেও ২০১৫ সালের অভিবাসী সংকটের পোপ ফ্রান্সিস যখন অভিবাসীদের গীর্জায় আশ্রয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, তখন এর বিরোধিতা করে ভ্যাটিকানে অনেকের ভ্রূ কুঁচকে দিয়েছিলেন পিটার এরডো।
ওই সময় তিনি বলেছিলেন, এটা হবে মানব পাচারের মতো। এমন বক্তব্য হাঙ্গেরির জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের সঙ্গে মিলে যায়।
গির্জার আইন বিশেষজ্ঞ, এরডো তার পুরো ক্যারিয়ারে দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেছেন। বয়সে চল্লিশের কোঠায় বিশপ এবং ২০০৩ সালে মাত্র ৫১ বছর বয়সে কার্ডিনাল হন তিনি। ওই সময় থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কলেজ অব কার্ডিনালের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন তিনি।
ইতালীয় ভাষায় চমৎকার দক্ষতা আছে তার। কথা বলতে পারেন জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ এবং রুশ ভাষায়ও। ইউক্রেনের যুদ্ধ কারণে ক্যাথলিক এবং রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের মধ্যে যে শীতল সম্পর্ক, ভাষা দক্ষতা দিয়ে তিনি হয়ত সেখানে বরফ গলাতে পারবেন।
ক্যারিশম্যাটিক বক্তা নন পিটার এরডো, যেটাকে একসময় নিঃসন্দেহে পোপ হওয়ার জন্য বাধা হিসেবে দেখা হত। তবে, পোপ ফ্রান্সিসের জ্বালাময়ী শাসনের পর কার্ডিনালরা যদি একজন শান্ত পোপ চান, তাহলে এটা ভালোদিক হিসাবেও বিবেচনা করা হতে পারে।