আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: শুক্রবার , ২৮ মার্চ , ২০২৫
চার বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ, তীব্র খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক অবনতির মধ্যে মিয়ানমারে নতুন বিপর্যয় ডেকে এনেছে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
শুক্রবার মধ্য মিয়ানমারের সাগাইং শহরে আঘাত হানে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প। এরপর আরো চারটি পরাঘাত আঘাত হেনেছে, যার একটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ৮।
ভূমিকম্পের পর থেকে ধ্বংসযজ্ঞের খবর আসতে থাকে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয় ও রাজধানী নেপিদো থেকেও। সাগাইং থেকে নেপিদোর দূরত্ব প্রায় ২৪১ কিলোমিটার।
এই ভূমিকম্পে মিয়ানমারের পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে থাইল্যান্ডে। দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।
বিবিসির খবরে বলা হয়, ভূমিকম্পের পর মিয়ানমারে তথ্য পাওয়াটা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। আক্রান্ত এলাকার মোবাইল নেটওয়ার্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ ও ইন্টারনেট সেবার বাইরে চলে গেছেন লাখ লাখ মানুষ।
ভেঙে পড়েছে বহু এলাকার বাড়িঘর, মসজিদ, উপড়ে গেছে গাছ। ফাটল ধরেছে রাস্তায়, ভেঙে গেছে সেতু, বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে গেছে।
তবে মিয়ানমারে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়। মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটির পরিচালক মোহাম্মদ রিয়াজ বলেছেন, হাজার হাজার মানুষের জরুরি আশ্রয়, খাবার এবং চিকিৎসা সহায়তা দরকার।
বহু এলাকায় ভূমিকম্পের প্রভাব কতটা পড়েছে তা জানতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে বলেও তার ধারণা।
রেড ক্রসের আশঙ্কা, মিয়ানমারের বড় বড় বাঁধগুলোতে কম্পনের কারণে ফাটল ধরে থাকতে পারে। ফলে বন্যাও দেখা দিতে পারে। এতে বিপর্যয় আরও বাড়বে।
হতাহত বাড়ছেই
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের হিসাবে, রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার প্রথম ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের ১৭ দশমিক ২ কিলোমিটার দূরে, মাটির ১০ কিলোমিটার গভীরে।
দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশেও সেই কম্পন অনুভূত হয়েছে।
ভূমিকম্পে মিয়ানমারে ১৪৪ জন নিহত ও ৭৩২ জন আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছেন দেশটির এক সামরিক কর্মকর্তা।
দেশটির সামরিক জান্তা নেতা মিন অং হ্লায়িং রাজধানী নেপিদোয় ৯৬ জন, সাগাইংয়ে ১৮ জন এবং মান্দালয়ে ৩০ জন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছেন।
মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি। আহত যারা হয়েছেন তাদের ১৩২ জনই নেপিদোর এবং ৩০০ জন সাগাইংয়ের বাসিন্দা বলে জানিয়েছেন তিনি।
ভূমিকম্প-বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারে গত ২০ বছরের মধ্যে এত তীব্র ভূমিকম্প আর দেখা যায়নি।
ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পাশের দেশ থাইল্যান্ডও। দেশটির রাজধানী ব্যাংককে নির্মাণাধীন ৩০ তলা ভবন ধসে পড়ে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। অন্তত ৮১ জন ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ার তথ্য দিয়েছেন থাইল্যান্ডের উপ-প্রধানমন্ত্রী। তারা প্রায় সবাই নির্মাণ শ্রমিক।
রয়টার্স জানায়, ওই ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ চলছে। নিখোঁজদের হন্যে হয়ে খোঁজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা।
ভূমিকম্প মিয়ানমারে নতুন নয়। ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে দেশটিতে শক্তিশালী ছয়টি ভূমিকম্প হওয়ার ইতিহাস আছে। মিয়ানমারের উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত সাগাইং চ্যুতিরেখা। সেকারণে প্রায়ই ভূমিকম্প হয় মিয়ানমারে।
থাইল্যান্ডে ভবন ধ্বংসস্তূপের নিচে ১১৭ জন
৭ থেকে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পকে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলা হয়। বিশ্বজুড়ে বছরে আনুমানিক ১৮টি এমন ভূমিকম্প হয়। এর চেয়ে তীব্র ৮ থেকে ৮ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পকে বলা হয় প্রলংকরী, এ ধরনের ভূমিকম্প বছরে আনুমানিক একটি হয়ে থাকে।
গতকালের ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি এত শক্তিশালী ছিল যে উৎপত্তিস্থল থেকে ১ হাজার ২০ কিলোমিটার দূরত্বের ব্যাংককে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে ব্যাংককে ৩৩ তলা একটি নির্মাণাধীন ভবন ধসে পড়েছে।
ওই ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে অন্তত ১১৭ জন চাপা পড়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখানে অন্তত ৪০৯ জন উদ্ধারকাজে নেমেছেন।
ব্যাংককে হতাহতের বিষয়ে শহরের ডেপুটি গভর্নর তাভিদা কামোলভেজ বলেন, নির্মাণাধীন ওই ভবনের নিচে চাপা পড়ে এ পর্যন্ত আটজনের মৃত্যু হয়েছে। শহরের আরেক এলাকায় নিহত হয়েছেন একজন।
পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে আছে জানিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপান্ত।
ব্যাংকক একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। ভূমিকম্পে গতকাল বিকেল পর্যন্ত শহরটিতে ১৬৯টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গতকাল ভূমিকম্পের সময় লোকজন ভয়ে রাস্তায় ছোটাছুটি শুরু করেন। অনেকেই ছিলেন পর্যটক। কম্পনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে একটি অভিজাত হোটেলের ছাদের সুইমিংপুল থেকে পানি উপচে নিচে পড়তে থাকে।