আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: সোমবার , ১৭ মার্চ , ২০২৫
সমরাস্ত্রের আলোচনা শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনের নাম বলার পরই মানুষের মুখে উঠে আসে উদীয়মান মুসলিম পরাশক্তি তুরস্কের কথা।
গত এক শতকে খেলাফত ভেঙে ধর্মনিরপেক্ষ পশ্চিমা ধাঁচের রাষ্ট্র সেখান থেকে আবার গণতান্ত্রিক পন্থায় উদার মুসলিম রাষ্ট্রে রূপান্তর হওয়া তুরস্ক মুসলিম বিশ্বের পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বেও সমান গুরুত্ব অর্জন করেছে।
ভৌগলিক অবস্থান, ইতিহাস, ঐতিহ্যের পাশাপাশি এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে রপ্তানিমুখী সমরাস্ত্র শিল্পের। তুরস্কের তৈরি ড্রোন ইউক্রেইন রাশিয়া যুদ্ধে বেশ কয়েকবার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। যদিও দেশটি সরাসরি এই যুদ্ধে কোনো পক্ষভূক্ত হয়নি।
২০২৪ সালে তুরস্ক রেকর্ড ৭১০ কোটি ডলারের অস্ত্র রপ্তানি করেছে যা দশককাল আগেও যা ছিল মাত্র ১৯০ কোটি ডলার।
অস্ত্রের জগতে কীভাবে?
আরব বিশ্বের দেশ হলেও আরবদের থেকে স্বতন্ত্র ইসলামি সংস্কৃতি লালন করে তুরস্ক। জাতি হিসাবে যেমন স্বাধীন চেতা আবার তাদের মধ্যে আঞ্চলিক নেতৃত্বের স্পিহাও চরম।
সবকিছু মিলিয়ে ন্যাটোর সদস্যভূক্ত এই দেশটি সমরাস্ত্র শিল্পে স্বনির্ভর বা সমৃদ্ধ হওয়ার গোড়াপত্তন করেছে ১৯৮৫ সালে। সেই সময় প্রতিরক্ষা খাত উন্নয়ন ও সহায়তা প্রশাসন কার্যালয়- সাগেব প্রতিষ্ঠা করে তুরস্ক। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা।
শুরুর দিকে সাগেবের নজর ছিল গবেষণা ও অস্ত্র আধুনিকায়নে। কিন্তু নানা সময়ে অস্ত্র কেনায় নানান বিধিনিষেধের কারণে দেশটি স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে মনোযোগী হয়।
২০১০-এর দশকে তারা স্থানীয় নকশার দিকে নজর দেয়; সাফল্যও আসে খুব দ্রুত। একই সময়ে তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎপাদনও ব্যাপক বাড়তে থাকে।
এখন তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাতের কয়েক হাজার উৎপাদক ভূমি, আকাশ ও নৌপথে কার্যকর অস্ত্র ও সরঞ্জাম বানাতে সক্ষম, যাদের স্বীকৃতি মিলছে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকেও।
২০১৪ সালে প্রথম স্বয়ংক্রিয় উড়ন্ত যান (ড্রোন) বায়রাকতার টিবিটু সামনে নিয়ে আসে তুরস্ক যা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া তুর্কি প্রতিরক্ষা পণ্য।
মাঝারি উচ্চতায় উড়তে সক্ষম, দীর্ঘস্থায়ী, ২০০ কেজি ওজন বহনে সক্ষম আনকা-এস এবং ৭০ কেজি ওজন বহনে সক্ষম ভেস্তেল কারায়েল ড্রোনের মতো আরও কয়েকটি উড়ন্ত যানের চাহিদাও ব্যাপক।
আকাশপথে আসা হুমকি শনাক্ত ও নিস্ক্রিয় করতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘স্টিল ডোম’ বানাতেও কাজ করছে তুরস্ক। পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ নির্মাণেও হাত দিয়েছে তারা, যা পুরনো মার্কিন এফ-সিক্সটিনের স্থলাভিষিক্ত হবে।
তুরস্কের সাঁজোয়া যান নিয়েও অনেকের আগ্রহ আছে। এর মধ্যে মূল যুদ্ধ ট্যাঙ্ক আলতাই বানানোই হয়েছে জার্মানির লেপার্ড ও মার্কিন আব্রামকে টক্কর দিতে। তুর্কি সেনাবাহিনীর একটি মাইন-প্রতিরোধী যানও আছে, কিরপি, বিদ্রোহ দমন অভিযানে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আঙ্কারার ভাণ্ডারে আরও আছে কাপলান ও পারসের মতো অত্যাধুনিক পদাতিক যুদ্ধযান।
তুরস্কের জন্য নতুন নৌযান বানানোর লক্ষ্যে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ন্যাশনাল শিপ প্রজেক্ট- মিলগেম। এর হাত ধরেই তুরস্ক বানিয়েছে আডা-শ্রেণির করভেটস ও ইস্তাম্বুল-শ্রেণির ফ্রিগেটস। আরও অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ও ডুবোজাহাজ বানানোর পরিকল্পনাও আছে তাদের।
তুরস্কের কাছে যেসব নৌযান আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে ড্রোনবাহী উভচর যান টিসিজি আনাদোলু, এটিই তুর্কি নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় জাহাজ, মোতায়েন হয়েছে ২০২৩ সালে।
আন্তর্জাতিক বাজারে যেসব তুর্কি যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জামের চাহিদা রয়েছে, তার দীর্ঘ তালিকায় আরও আছে অত্যাধুনিক গোলাবারুদ, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা, স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বোরা ও দীর্ঘপাল্লার আতমাকা ক্ষেপণাস্ত্র।
যেভাবে তুরস্ক অস্ত্র জগতে
মূলত ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে’ বিদেশি হস্তক্ষেপই আঙ্কারাকে দেশে সামরিক সরঞ্জাম বানাতে উদ্দীপ্ত করেছে। ১৯৭০ এর দশকের মাঝামাঝি সাইপ্রাসে তুরস্কের হস্তক্ষেপ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র আঙ্কারার ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দেয়।
১৯৯০ এর দশকের শুরুর দিকে জার্মানি দেশটিতে অস্ত্র রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কারণ? তুরস্কের কাছে তারা যেসব সাঁজোয়া যান বিক্রি করেছে সেগুলো আঙ্কারা দেশের ভেতরে ব্যবহার করেছে; অথচ বিক্রির চুক্তিতে স্পষ্টভাষায় লেখা ছিল—এসব সাঁজোয়া যান কেবল তখনই ব্যবহার করা যাবে যখন তুরস্ক নেটোভুক্ত নয় এমন কোনো দেশ দ্বারা আক্রান্ত হবে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র ২০২০ সালের দিকেও তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, রাশিয়ার এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা কেনায়। ততদিনে অবশ্য আঙ্কারা অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। এখন তুরস্কজুড়ে প্রায় তিন হাজার অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানি আছে।
গত কয়েক বছরে তুরস্কের অস্ত্র রপ্তানি বেড়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাদের কব্জায় এখন বৈশ্বিক অস্ত্র রপ্তানির ১ দশমিক ৭ ভাগ। ২০২০ থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশটি বিশ্বের প্রতিরক্ষা রপ্তানিকারকদের তালিকায় একাদশ স্থানেই আছে, বলছে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি)।
পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর তুরস্কের রপ্তানি করা অস্ত্র পৌঁছেছে ১৭৮টি দেশে; যা ২০১৫-২০১৯ সালের তুলনায় ১০৩ শতাংশ বেড়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্কের অস্ত্রের প্রধান ক্রেতা সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান ও কাতার, বলছে সিপ্রি।
দেশটির সমরাস্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়—স্বল্প উচ্চতায় উড়তে সক্ষম দীর্ঘস্থায়ী বায়রাকতার ইরাক, ইউক্রেইন, কেনিয়া, বাংলাদেশ, জাপানসহ ৩১টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এই ড্রোনের উৎপাদক বায়কার গত বছর নিজস্ব জেট ইঞ্জিন বানাতে ৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে- তাদের আকিনচি ড্রোনের জন্য স্থানীয় ইঞ্জিন এবং এখনও নির্মাণাধীন মনুষ্যবিহীন ড্রোন যুদ্ধবিমান কিজিলেলমার জন্য টার্বোফ্যান ইঞ্জিন বানানো। এতদিন উভয় যানের ক্ষেত্রেই তারা ইউক্রেইনের ইঞ্জিন ব্যবহার করেছে।
[আল জাজিরা ইংলিশের এক্সপ্লেইনার অবলম্বনে]