প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: মঙ্গলবার , ১৫ জুলাই , ২০২৫
বাংলাদেশের প্রশাসন ও শিক্ষাব্যবস্থায় ‘স্যার’ ও ‘ম্যাডাম’ শব্দ দুটি যেন শুধুই সম্বোধন নয়—এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও শ্রেণীকাঠামোর প্রতীক। অথচ এই সম্বোধনের শিকড় খুঁজলে তা স্পষ্টভাবে বুঝা যায় এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের সংস্কৃতির অংশ।
লেখক ও গবেষক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার বই “ঔপনিবেশিকোত্তর ঔপনিবেশিক মন”-এ লিখেছেন, ‘স্যার’ ও ‘ম্যাডাম’ ডাক মূলত আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যম ছিল, যা ধীরে ধীরে শ্রদ্ধাবোধের মোড়কে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
বাংলাদেশের অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিচারালয়—সবখানেই এই সম্বোধনের ব্যবহার এতটাই প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে উঠেছে যে, তা ছাড়া কথা বলার কথা অনেকের কল্পনায়ই আসে না। অথচ বাস্তবতা হলো, সরকারি পর্যায়ে এই সম্বোধনের কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই।
ইংরেজি ‘স্যার’ শব্দটির উৎপত্তি ফরাসি ‘সায়ার’ থেকে, যার অর্থ প্রভু। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে এটি দাসত্ব ও চাকরানুবর্তিতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো—“Slave I Remain অর্থাৎ আমি দাসই থেকে গেলাম” বা “Servant I Remain অর্থাৎ আমি চাকরই থেকে গেলাম”—এমন ব্যাখ্যাও রয়েছে বিভিন্ন গবেষণায়। একইভাবে, ‘ম্যাডাম’ শব্দটিও এসেছে ‘মাদাম’ থেকে, যার মূলত অভিজাত ও শ্বেতাঙ্গ নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা বা শ্রেণিভেদমূলক সম্বোধন বোঝাতে ব্যবহৃত হতো।
ভারতীয় উপমহাদেশে এই শব্দগুলোর প্রচলন ঘটে ১৭শ শতকে, ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের পর। প্রশাসন, আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় এই সম্বোধন চালু হয় মূলত শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তাদের প্রতি স্থানীয় জনসাধারণের আনুগত্য বোঝাতে।
বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিতে আগে শিক্ষককে বলা হতো ‘মাস্টারমশাই’ বা ‘পণ্ডিতমশাই’। মুঘল আমলে সম্রাটদের ডাকা হতো ‘জাঁহাপনা’, ‘হুজুর’ নামে। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে এই শব্দগুলো হারিয়ে গিয়ে জায়গা নেয় ‘স্যার-ম্যাডাম’।
১৮৩৫ সালে লর্ড ম্যাকলে উপনিবেশে এমন একটি শ্রেণি গঠনের প্রস্তাব দেন যারা “রঙে ভারতীয়, কিন্তু চিন্তায় ব্রিটিশ” হবে। তার প্রস্তাবের ফলে তৈরি হয় ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থা, যার সঙ্গে আসে স্যার-ম্যাডাম বলার সংস্কৃতি।
ব্রিটিশ বিদায়ের পরও বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি বহাল থাকে। বিশেষত শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাঠামোয় এটি এখন একপ্রকার নিয়মে রূপ নিয়েছে। স্কুল-কলেজগুলোয় শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলতে বাধ্য। বিচারালয়ে ‘স্যার’, ‘ইওর অনার’, এমনকি ‘মাই লর্ড’ বলাও চলমান।
আসলে, আইন বা বিধিমালায় কোথাও এই সম্বোধনের বাধ্যবাধকতা নেই। ১৯৯০ সালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ‘স্যার’ শব্দের পরিবর্তে ‘জনাব’ ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকারি কর্মকর্তাদের পত্রের শুরুতে পুরুষের ক্ষেত্রে ‘মহোদয়’ ও নারীর ক্ষেত্রে ‘মহোদয়া’ লেখা যেতে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৫ সালের ১১ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকারের এক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী ও সিনিয়র নারী কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বলার প্রথা বাতিল করা হয়। একে “অপ্রাসঙ্গিক” বলেই চিহ্নিত করা হয়।
অবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই সম্বোধন কি আদৌ শ্রদ্ধা প্রকাশ, না কি ক্ষমতার কাঠামোর প্রতি অন্ধ আনুগত্যের প্রতিচ্ছবি? সময় এসেছে এই প্রশ্নের উত্তর নতুন করে ভাবার।