প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
এ বছরের শুরুতে এক পডকাস্টে গুগল এআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা জেফ ডিন এমন এক প্রযুক্তিগত ধারণা নিয়ে কথা বলেছিলেন, যা তখন কেবল সিলিকন ভ্যালির ভেতরের মহলগুলোতেই আটকে ছিল। শব্দটি হচ্ছে, ‘ডিস্টিলেশন’।
গুগলের এআই মডেলগুলোর উন্নয়ন প্রসঙ্গে ডিন বলেছিলেন, বড় আকারের জটিল ইমেজ রিকগনিশন মডেলের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে গিয়ে তারা ও তাদের সহকর্মীরা এ ‘ডিস্টিলেশন’ কৌশল উদ্ভাবন করেছেন।
ছোট বিভিন্ন এআই মডেলকে আরও দক্ষ ও শক্তিশালী করে তোলার প্রধান উপায় হচ্ছে এই ডিস্টিলেশন। এ কাজের জন্য আপনাকে আগে বিশ্বমানের বা সামনের সারির এআই মডেলের সাহায্য নিতে হয়, যা থেকে মূল বিষয়গুলো ছেঁকে বা ‘ডিস্টিল’ করে ছোট মডেলে রূপান্তর করা যায়। এর কেবল পাঁচ মাস পর সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে মার্কিন রাজনৈতিক কেন্দ্র ওয়াশিংটন ডিসি পর্যন্ত এ ‘ডিস্টিলেশন’ নিয়ে তুমুল বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও আইনপ্রণেতারা এখন জোর আলোচনা করছেন, এই চর্চা আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি কি না এবং এর মাধ্যমে তীব্র এআই প্রতিযোগিতায় চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে ফেলছে কি না। এ উদ্বেগের আগুনে ঘি ঢালে চীনভিত্তিক গবেষণা কোম্পানি ‘মুনশট এআই’-এর তৈরি নতুন মডেল ‘কিমি কে৩’। বাজারে আসার পরপরই ব্যবহাকারীরা দেখতে পান, অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের সবচেয়ে সেরা ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক মডেলের সঙ্গে সমানে সমানে টেক্কা দিচ্ছে এই চীনা মডেল।
আমেরিকান শীর্ষ এআই কোম্পানিগুলোর কৌশল হচ্ছে, নিজস্ব এআই মডেলে প্রবেশের সুবিধা বিক্রি করা। তবে তাদের থেকে বিপরীত পথে হেঁটে মুনশট ও অন্যান্য চীনা ল্যাব প্রচলিত ‘ওপেন-ওয়েট’ মডেল বাজারে চালু করছে। ফলে যে কোনো ব্যবহারকারী এ প্রযুক্তি বিনামূল্যে ডাউনলোড করে, পছন্দমতো পরিবর্তন এনে যে কোনো জায়গায় ব্যবহার করতে পারছেন।
অনেক মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, এত দ্রুত চীনের এ অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে আমেরিকান এআই মডেলের ডিস্টিলেশনের মাধ্যমে। বিষয়টিকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মেধা সম্পত্তি চুরি হিসেবে দেখছেন তারা, বিশেষ করে মুনশটের বিরুদ্ধে অ্যানথ্রপিকের ‘ফেইবল’ মডেলের ডেটা চুরির অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা মাইকেল ক্র্যাটসিওস এক এক্স পোস্টে দাবি করেছেন, আমাদের কাছে তথ্য আছে, মুনশট এআই তাদের ‘কে৩’ মডেল তৈরির জন্য অ্যানথ্রপিকের ‘ফেইবল’ মডেল থেকে ডিস্টিলেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। ধরাছোঁয়া থেকে বাঁচতে তারা এমন এক জটিল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা আমেরিকার বিভিন্ন এআই মডেল থেকে গোপনে ও বিপুল পরিমাণে তথ্য সংগ্রহের সুবিধা দেয়।
সহজ কথায়, ডিস্টিলেশন হচ্ছে, কোনো উন্নতমানের চ্যাটবট বা এআই মডেল থেকে পাওয়া উত্তর ও আউটপুট ব্যবহার করে অপেক্ষাকৃত অন্য এক দুর্বল বা নতুন এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের কারণ, যাদের কোটি কোটি ডলার খরচ করে উন্নত এআই প্রযুক্তি তৈরির সক্ষমতা নেই তারা স্রেফ অন্যের তৈরি করা এসব আউটপুট নকল করেই উন্নতমানের বাণিজ্যিক এআই তৈরি করে ফেলতে পারে।
বিষয়টিকে একটি উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন এআই নিরাপত্তা সংগঠন ‘সিকিউরিটি প্যাল’-এর প্রতিষ্ঠাতা পুকার হামাল।
“একজন শিক্ষার্থী ক্লাসে লেকচার শুনল, টেক্সটবই পড়ল ও কঠোর পরিশ্রম করে সব হোমওয়ার্ক শেষ করল। আর অন্য একজন অলস শিক্ষার্থী এসে বলল, ‘ধুর, আমি তো ওগুলো কিছুই করিনি। আমি কি তোমার খাতা দেখে হুবহু টুকে নিতে পারি?’ এআই ডিস্টিলেশনের বিষয়টি যেন এমনই।”
হোয়াইট হাউস উপদেষ্টার এমন কঠোর বার্তার কারণ কী তা নিশ্চিত নয়। তবে এর পরেই বিশ্ব কাঁপানো মার্কিন বিভিন্ন প্রযুক্তি জায়ান্ট একাট্টা হয়েছে। শুক্রবার যৌথ এক খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে এনভিডিয়া, মাইক্রোসফট, মেটা ও প্যালান্টির’সহ ২০টিরও বেশি শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানি।
নীতি নির্ধারকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া ওই চিঠিতে তারা অনুরোধ করেছেন, ‘ওপেন-ওয়েট’ এআই মডেলগুলোর ওপর যেন অহেতুক কোনো ‘অকাল নিষেধাজ্ঞা’ চাপিয়ে দেওয়া না হয়। এতে করে প্রযুক্তি খাতের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা নষ্ট হবে এবং আমেরিকান উদ্ভাবন সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশে চলে যাবে।
যৌথ বিবৃতিতে প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো লিখেছে, “ডিস্টিলেশন, অর্থাৎ একটি মডেলের প্রস্তুতকৃত ফলাফল ব্যবহার করে অন্য মডেলের সক্ষমতা বাড়ানো, বিবর্তন বা ভুলত্রুটি সংশোধনের এ চর্চাটি বিশ্বজুড়ে এআই উন্নয়নের স্বাভাবিক ও বহুল ব্যবহৃত একটি কৌশল।”
চীন সমস্যাকে জটিল করে তোলা
জর্জেটাউন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ইমার্জিং টেকনোলজি বা সিএসইটির গবেষক কলিন শিয়া-ব্লিমার বলেছেন, মার্কিন সরকার এখন এ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করছে। মার্কিন সরকার যুক্তি দিতে পারে, চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের বিভিন্ন কোম্পানি কঠোর পরিশ্রমে তৈরি আমেরিকান বিভিন্ন মডেলর আউটপুট বা ফলাফল ব্যবহার করে নিজেদের শক্তিশালী করছে, যা তাদের বাজারে অসদুপায় বা অন্যায্য সুবিধা দিচ্ছে।
শুক্রবার মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে পাঠানো চিঠিতে স্বাক্ষরকারী অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি নির্বাহী ছিলেন ক্লাউড সার্ভিস কোম্পানি ‘বক্স’-এর সিইও অ্যারন লেভি।
এক সাক্ষাৎকারে লেভি বলেছেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে মার্কিন বিভিন্ন কোম্পানিরও সব সেরা প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার থাকা প্রয়োজন তা সে যেখানেই তৈরি হোক না কেন। সাধারণত উদ্ভাবনের ধারা যত বাড়বে যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা অন্য যেখান থেকেই আসুক না কেন এআইয়ের অগ্রগতিও তত বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এমনটা প্রযুক্তিকে আরও কম খরচে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে।
সাম্প্রতিক সময়ে মূল আলোচনা চীনা কোম্পানি মুনশটের ‘কিমি কে৩’-এর মতো ‘ওপেন-ওয়েট’ এআই মডেলগুলোকে ঘিরে হচ্ছে। তবে ইনফো-টেক রিসার্চ গ্রুপের গবেষণা পরিচালক শশি বেলামকন্ডা বলেছেন, নিজ নিজ মডেল তৈরিতে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি কোম্পানিই কোনো না কোনোভাবে ডিস্টিলেশন কৌশল ব্যবহার করেছে।
যেমন, প্রযুক্তি জায়ান্ট এনভিডিয়া তাদের ‘লামা নেমোট্রন’ সিরিজ মডেল প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ডিস্টিলেশন ব্যবহার করেছে, যা তাদের প্রকাশিত গবেষণা পত্রেও উল্লেখ রয়েছে।
বেলামকন্ডা বলেছেন, “বড় ও ব্যয়বহুল মডেলের তৈরি ডেটা ব্যবহার করে অপেক্ষাকৃত ছোট ও সাশ্রয়ী মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া বৈধ এবং একটি বহুল ব্যবহৃত কার্যকর পদ্ধতি। এমনটা সব সময়ই চর্চার বিষয় হয়ে আসছে।”
তবে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে মার্কিন এআই চ্যাটবট ক্লড-এর নির্মাতা কোম্পানি অ্যানথ্রপিক। তাদের এআই কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও বড় ব্যবসা রক্ষার তাগিদ রয়েছে কোম্পানিটির।
ফেব্রুয়ারিতে অ্যানথ্রপিক বলেছে, চীনের ডিপসিক, মুনশট ও মিনিম্যাক্স-এর মতো বিভিন্ন কোম্পানি প্রায় ২৪ হাজার ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ বার আদান-প্রদান করার মাধ্যমে ‘ইন্ডাস্ট্রি লেভেলে’ ক্লডের ডেটা চুরি ও ডিস্টিল করেছে।
বর্তমানে প্রায় এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলার মূল্যায়নের কোম্পানি অ্যানথ্রপিক শিগগিরই শেয়ারবাজারে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। অবৈধ ডিস্টিলেশন বন্ধ করাকে সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে ঘোষণা করেছে তারা।
ফেব্রুয়ারিতে এক পোস্টে অ্যানথ্রপিক বলেছে, “অ্যানথ্রপিকসহ অন্যান্য মার্কিন কোম্পানি এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেন গড়ে তোলে, যাতে কোনো অসাধু রাষ্ট্র বা অপরাধী গোষ্ঠী এআই ব্যবহার করে জৈবিক অস্ত্র তৈরি বা সাইবার হামলা চালাতে না পারে।”
বর্তমানে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক উভয় কোম্পানিই তাদের শর্তাবলীতে অন্য কোনো মডেল প্রশিক্ষণে নিচেদের এআই আউটপুট ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।
বেলামকন্ডা বলেছেন, তারা বোঝাতে চাচ্ছে, অনুমতি ছাড়া তাদের বড় মডেলের আউটপুট ব্যবহার করা স্পষ্টত মেধাসম্পদ চুরির শামিল। তবে এআই উন্নয়নের ব্যয় যে হারে আকাশচুম্বী হচ্ছে তাতে এসব কোম্পানি নিজেদের কার্যসক্ষমতা বাড়াতে যে কোনো পথ বেছে নিতে প্রস্তুত।
এআই নিরাপত্তা কোম্পানি ‘সিকিউরিটি প্যাল’-এর প্রতিষ্ঠাতা পুকার হামাল বলেছেন, মুনশটের ‘কিমি কে৩’-এর মতো চীনা ‘ওপেন-ওয়েট’ মডেল ব্যবহার করতে তাদের কোনো বাধা নেই। কারণ এতে কোম্পানির বিপুল অর্থ সাশ্রয় হতে পারে।
অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই যখন আইপি চুরির অভিযোগে সরব হচ্ছে তখন নিজেদের তৈরি বিভিন্ন এআই মডেলে ব্যবহৃত লাখ লাখ ডেটা বা কনটেন্টের উৎস নিয়েও তাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
অন্যান্য নির্মাতাদের কনটেন্ট অনুমতি ছাড়া ব্যবহারের অভিযোগে তাদের নিজেদের বিরুদ্ধেও আদালতে বহু মামলা চলছে।